• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৬:২৩ অপরাহ্ন
Headline
আন্তর্জাতিক মিডওয়াইফ দিবসে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে দক্ষ মিডওয়াইফ তৈরির আহ্বান গাইবান্ধায় দুদকের গণশুনানি উপলক্ষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় তিস্তামুখ- বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত সড়ক ও রেলসেতু নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন তিতাসে খাল খনন কাজের উদ্বোধন করলেন এমপি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া র‍্যাবের ওপর হামলা, অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক-অস্ত্রসহ আটক ১৩ জিন তাড়ানোর কথা বলে দাখিল পরীক্ষার্থীকে ধর্ষণ, ‘ভণ্ড কবিরাজ’ গ্রেফতার ১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় আসামি গ্রেফতার হাওরাঞ্চলে স্বস্তির রোদে ধান নিয়ে ব্যস্ত কৃষক কিশোরগঞ্জে হাসপাতালের নাস্তায় পাউরুটির সঙ্গে কাঁচা কলা ফতুল্লায় স্কুলে ক্লাস চলাকালীন খুলে পড়লো সিলিং ফ্যান, আহত ৫

হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে খোলা আকাশের নিচে কার্গো পণ্য

Reporter Name / ২৯ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খোলা আকাশের নিচে রানওয়েতে পড়ে আছে মূল্যবান আমদানি-রপ্তানি পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও দামী যন্ত্রপাতি। বৃষ্টি ও তীব্র গরমে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এসব পণ্য। এতে শুধু ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতিই বাড়ছে না, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দরটির ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তবে এ পরিস্থিতির দায় নিতে রাজি নয় সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ।
কার্গো কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং অবকাঠামোর মালিক বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ক্যাব) একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে। এদিকে, জবাবদিহির অভাবে ক্ষতির বোঝা বইতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদেরই। মূল কার্গো গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ার পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
গত বছরের ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের কার্গো ওয়্যারহাউজ পুড়ে যায়। এরপর ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও নতুন ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করা হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই তিন মাসের জন্য একটি অস্থায়ী গুদামের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার অর্থায়ন করে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ওই গুদাম ভাড়া নিতে সংগঠনটির নিজস্ব তহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, “খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে পণ্য নষ্ট হওয়ায় আমরা সরকারের কাছে চিঠি লিখে দ্রুত ওয়্যারহাউজ স্থাপনের অনুরোধ করেছি। কিন্তু সবাই এখন তৃতীয় টার্মিনাল কবে চালু হবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে।”
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) মহাসচিব ড. মো. জাকির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। পণ্য নষ্ট হওয়া ঠেকাতে দুটি কোল্ড রুম ও অস্থায়ী টেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে জায়গা কম থাকায় ৩-৪ দিনের বেশি পণ্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি আরও বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুম আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। জায়গা সংকটের কারণে পণ্য জমে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য খালাসের উদ্যোগ নেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩০ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো আমদানি) মো. জাহিদুজ্জামান বিজিএমইএ সভাপতিকে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, আমদানিকৃত মালামালের আধিক্যের কারণে প্রয়োজনীয় গুদাম সুবিধা না থাকায় অধিকাংশ পণ্য গুদামের বাইরে রাখা হচ্ছে। এতে বৃষ্টি ও প্রখর রোদে মূল্যবান পণ্যের গুণগতমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যথাযথ হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। চিঠিতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত খালাসের অনুরোধ জানানো হয়।
বিমানবন্দরের ভেজা রানওয়েতে খোলা আকাশের নিচে এলোমেলোভাবে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা পণ্যের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, পড়ে থেকে অনেক পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত সপ্তাহের শেষে ভারী বৃষ্টির সময়কার ওই ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা যে কি পর্যায়ে আছি, এগুলো তো মানুষকে দেখানো দরকার। এই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশ বিমান ওয়্যারহাউজ, আমরা খোলামাঠে মাল ডেলিভারি করি। আপনাদের মাল ভেজে, তার কারণটা কি দেখেন। কোনো ধরনের গোডাউন নেই, শেড নেই। আমরা রানওয়েতে দাঁড়িয়ে কাজ করি। এই হলো আমাদের অবস্থা।’ ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা পণ্য দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ত্রিপল দিয়ে এভাবে মাল ঢেকে রাখি। কিন্তু পানিতো এটা মানে না। ত্রিপলের কোনা, কিংবা ফুটাফাটা দিয়ে পানি ঢুকেই। বাতাসে ত্রিপল উড়ে যায়।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সঠিক বলে নিশ্চিত করেছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
বিমান কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন স্থাপনা নির্মাণের জন্য তারা বারবার ক্যাবকে অনুরোধ জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, তারা শুধু জায়গাটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করে, সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের এখতিয়ার তাদের নেই।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর সিভিল এভিয়েশন দুটি অস্থায়ী কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করেছে এবং ওয়্যারহাউজ আংশিক সংস্কার করেছে। সেখানে প্রায় ১০০ টন পণ্য রাখা যায়, অথচ প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কার্গো আসে। বাকি পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “ওয়্যারহাউজের মালিক সিভিল এভিয়েশন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস থেকে তাদের কয়েকবার চিঠি দিয়ে দ্রুত ওয়্যারহাউজ নির্মাণের অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিজিএমইএ ও ফার্মাসিউটিক্যাল মালিকদের সংগঠনকেও অনুরোধ করেছি, যাতে পণ্য আসার পর দ্রুত খালাস করে নেওয়া হয়।” তিনি আরও বলেন, কাস্টমস কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দিয়ে দ্রুত কার্গো খালাসের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে, কারণ পণ্য সংরক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
বোসরা ইসলাম বলেন, “বিমানের আসলে কিছু করার নেই। আমরা কয়েকবার সিভিল এভিয়েশনকে চিঠি দিয়েছি। এখন তারাই বলতে পারবে, কবে কী করবে।”
অন্যদিকে, সিভিল এভিয়েশনের পক্ষে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ১৮ অক্টোবরের আগুনের পর অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে তিন মাসের জন্য অস্থায়ী শেড তৈরি করা হয়েছিল। পুড়ে যাওয়া অংশ আংশিক মেরামত করে কার্গো সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়। তবে তিনি বলেন, “যে পরিমাণ কার্গো আসছে, সে পরিমাণ পণ্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও রিসিপিয়েন্টরা খালাস করছেন না। সে কারণেই জায়গা সংকট তৈরি হচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করে নতুনভাবে চালু করা সহজ কাজ নয়। তিনি আরও বলেন, “আমরা জানি বর্ষা আসছে, বৃষ্টিতে পণ্য ভিজছে। কিন্তু যারা কনসাইনমেন্ট আনছেন, তারা দ্রুত পণ্য নিয়ে গেলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কাস্টমস, বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারা প্রস্তুত থাকলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা সন্ধ্যার পর পণ্য ডেলিভারি নেয় না। এমনকি সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তারা পণ্য খালাস করে না।”
রাগীব সামাদ জানান, বৃহস্পতিবার কার্গোর পরিমাণ ২০০ টনে নেমে এসেছিল। কিন্তু শুক্রবার ও শনিবার পণ্য খালাস না হওয়ায় তা বেড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, “যারা সময়মতো পণ্য ডেলিভারি নিচ্ছেন না, তাদের উচিত বিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পণ্য খালাস করা।”
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে কেন পণ্য খালাস হয় না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরিফুল আহসান গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি সম্প্রতি সংগঠনের দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করতে চান না। তবে সংগঠনটির সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ছুটির দিনে এলসি খোলা ব্যাংকগুলো বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানি পণ্যের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, অনেক পণ্যের খালাসের জন্য পে-অর্ডার বা রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টের মাধ্যমে শুল্ক পরিশোধ করতে হয়, যার জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু থাকা প্রয়োজন।
খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিমানপথে আমদানি হওয়া পণ্য সাধারণত জরুরি ও উচ্চমূল্যের হয়ে থাকে। “এসব পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়া কারও জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।”
এ সংকট মোকাবিলায় এলসি খোলা ব্যাংক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কাস্টমস এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
সংগঠনটির সাবেক এই নেতা আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরের কার্গো গুদামে সাধারণত বহুস্তরবিশিষ্ট র্যাকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে একই স্থাপনায় বিপুল পরিমাণ ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এখনও এ ধরনের ব্যবস্থা নেই।” তার মতে, ১ লাখ বর্গফুটের একটি গুদামে যদি চার স্তরের উল্লম্ব র্যাকিং ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে সেটি কার্যত ৪ লাখ বর্গফুটের গুদামের সমপরিমাণ পণ্য ধারণ করতে সক্ষম হবে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category