প্রভাত রিপোর্ট: দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের কাপড় ব্যবসার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে ইসলামপুর। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ হওয়া কাপড়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এই বাজার থেকে।
দেশজুড়ে সরবরাহ হওয়া কাপড়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে ইসলামপুর থেকে। পাশাপাশি, দেশের আমদানি করা পোশাকের কাপড় ও উপকরণের প্রায় ৪০ শতাংশের বাণিজ্যও হয় এই বাজারকে ঘিরে। ছবি: রাজীব ধর
ভোরের সেই সময়টায় সূর্য তখনও পুরোপুরি ওঠেনি। অথচ ইসলামপুরের সরু গলিগুলো এরই মধ্যে জেগে উঠেছিল, প্রস্তুতি নিচ্ছিল আরেকটি ব্যস্ত দিনের।
ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছিল কাপড়ের বাণ্ডিল। এক জোড়া হাত থেকে আরেক জোড়া হাতে পৌঁছে যাচ্ছিল সেগুলো। এই ছন্দ যেন সময়ের সঙ্গে বদলায়নি; মনে হচ্ছিল, শতাব্দী পেরিয়েও এই সরু গলিতে কাপড়ের আনাগোনায় খুব একটা বদল আসেনি। একে একে উঠতে শুরু করল দোকানের ঝাঁপ। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো শাড়ি, পাঞ্জাবির কাপড়, স্যুটের কাপড় আর বিছানার চাদর; রং ও বুননের অফুরন্ত বৈচিত্র্যে ভরে উঠল চারপাশ। দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের কাপড় ব্যবসার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে ইসলামপুর। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় সরবরাহ হওয়া কাপড়ের ৬০ শতাংশের বেশি আসে এই বাজার থেকে।
আমের ব্যবসা থেকে কাপড়ের সাম্রাজ্য
প্রায় তিন শতাব্দীর পথ পেরিয়ে ইসলামপুর এক বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে আরেক বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। মুঘল আমলে সম্রাট জাহাঙ্গীর ইসলাম খান চিশতীকে বাংলার প্রথম সুবাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে তার নাম থেকেই এলাকাটির নাম হয় ইসলামপুর। তবে ইসলামপুরের বাণিজ্যের গল্প কাপড় দিয়ে শুরু হয়নি। একসময় আমের ব্যবসার জন্য পরিচিত ছিল এলাকাটি। স্থানীয়ভাবে তখন এর নাম ছিল ‘আম পট্টি’। বুড়িগঙ্গার নৌপথ যোগাযোগকে সহজ করে তুলেছিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে পণ্য এসে জমা হতো এখানে। সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে ঢাকার চেহারা। বাড়তে থাকে জনসংখ্যা, বাড়ে সারা দেশে কাপড়ের চাহিদাও। ধীরে ধীরে বদলে যায় ইসলামপুরের বাণিজ্যিক পরিচয়। মৌসুমি আমের গুদামগুলো একসময় জায়গা ছেড়ে দেয় কাপড়ের দোকান ও পাইকারি বাজারকে।
ইসলামপুরের ৬৪ বছর বয়সী বাসিন্দা সালাম ব্যাপারীর স্মৃতিতেও রয়ে গেছে সেই সময়ের কথা। তিনি বলেন, ‘আমার দাদাও আম বিক্রি করতেন।’
১৯৯০-এর দশকেও ইসলামপুরের বড় অংশজুড়ে ছিল সরু গলির পাশের ছোট ছোট দোকান। টিনের চালের এক-দুই তলা ভবন আর সাদামাটা স্থাপনাই ছিল এলাকার পরিচিত চিত্র। পরের তিন দশকে সেই চিত্র আমূল বদলে যায়। গড়ে ওঠে ৯৫টির বেশি বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেট। এসব মার্কেটে এখন রয়েছে ১২ হাজারেরও বেশি দোকান। এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং তৈরি পোশাকশিল্পের বিস্তার।
ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় চারদিকে নতুন করে জায়গা বাড়ানোর সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। তাই ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটাতে শুরু করেন ওপরের দিকে—একটির পর একটি তলা যোগ করে।
সালাম ব্যাপারী জানান, ১৯৯০-এর দশক থেকে পুরোনো বাড়ি ও একতলা গুদাম ভেঙে সেখানে গড়ে উঠতে থাকে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। লায়ন টাওয়ার, জাহাঙ্গীর টাওয়ার ও শরীফ মার্কেট এরই উদাহরণ। একটি ভবনেই জায়গা হতো শত শত দোকানের। ফলে নতুন জমির প্রয়োজন ছাড়াই দ্রুত বাড়তে থাকে বাজারের পরিসর। তিনি জানান, কাপড়ের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় বড় দোকানের ভেতরের ছোট ছোট অংশ আলাদা করে দেওয়া হতো। এমনকি গলির জায়গাও কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হতো নতুন ছোট দোকান।
ইসলামপুরের এই রূপান্তরের সময়েই ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের বস্ত্র, ডাইং ও পাওয়ারলুম শিল্পও দ্রুত বিস্তার লাভ করে।
সালাম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল ও কেরানীগঞ্জে গড়ে উঠতে থাকে হাজার হাজার কাপড়ের কারখানা। বাড়তে থাকা এই কাপড়ের বড় অংশ বিক্রির প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে ইসলামপুর। ফলে একের পর এক নতুন শোরুমের প্রয়োজন তৈরি হতে থাকে।’ আগের দিনে ব্যবসায়ীরা হিসাবের খাতা ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ট্রাঙ্ক বা কাঠের বাক্সে সংরক্ষণ করতেন। আর স্থানীয়ভাবে ‘গদিঘর’ নামে পরিচিত গুদামের মতো দোকানগুলোতে প্রদর্শন করা হতো শুধু কাপড়ের নমুনা।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ১৭৭৩ সালে ইসলামপুরে পাইকারি কাপড়ের ব্যবসা শুরু হয়। ধীরে ধীরে এটি সারা দেশের কাপড় ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ব্রিটিশরা পাইকারি কাপড়ের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইসলামপুরে বিভিন্ন এজেন্সি স্থাপন করেছিল।
শত শত বছর ধরে ইসলামপুরে মসলিন, মৃৎশিল্প, চামড়া, লবণ ও কাপড়ের ব্যবসা বিকশিত হয়েছে। এভাবেই ঢাকার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এলাকাটি।
ফারুক অ্যান্ড সন্সের মালিক ৫৯ বছর বয়সী মো. ফারুক হোসাইন জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই তার বাবা কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি নিজেই সেই ব্যবসার দেখভাল করছেন।
সান শাইন টেক্সটাইলের মালিক বোরহানউদ্দিন গাজী বলেন, তার বাবা তাকে বলেছিলেন, শুরুতে ব্যবসায়ীরা বুড়িগঙ্গার কারণে ইসলামপুরে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। পণ্য পরিবহনে নদীপথটিই ছিল সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ইসলামপুর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বস্ত্র ও কাপড়ের বাজারে পরিণত হয়।
কেন ক্রেতারা এখনও ইসলামপুরমুখী?
ইসলামপুরের বাণিজ্যের ব্যাপ্তি বোঝা যায় প্রতিদিন এর দোকানগুলো দিয়ে চালান হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্যের দিকে তাকালেই। দেশের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাকের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ এবং আমদানি করা পোশাকের কাপড় ও উপকরণের প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ হয় এই বাজার থেকে।
বর্তমানে প্রায় ৯৫টি বাণিজ্যিক মার্কেটজুড়ে বিস্তৃত ইসলামপুর। হাজার হাজার স্থায়ী শোরুমের পাশাপাশি রয়েছে অস্থায়ী দোকানও। এসব দোকানকে ঘিরে প্রতিদিনের কর্মচাঞ্চল্যে সরু গলিগুলোয় ভিড় করেন কয়েক দশ হাজার মানুষ।
ইসলামপুর কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির (আইসিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত শোরুম রয়েছে ৬ হাজার ৫০০টির বেশি। রাস্তার পাশের দোকানগুলো ধরলে এই সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এসব ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন আনুমানিক ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার মানুষ।
আইসিএমএর সদস্য আলী আনসার মোল্লা বলেন, প্রতি বছর এই বাজারে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে নগদ লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকায় মোট লেনদেনের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন।
ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামপুরের বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়েছে সদরঘাট, ফরিদাবাদ ও আশপাশের এলাকাতেও। বর্তমানে এসব এলাকায় বিক্রমপুর গার্ডেন সিটি, গুলশান আরা সিটি, সাউথ প্লাজা, জাহাঙ্গীর টাওয়ার ও চায়না মার্কেটসহ ১৫০টির বেশি বাজারে কাপড় ও পোশাক বিক্রি হয়।
ফারুক জানিয়েছেন, তার দোকান সরাসরি কাপড় আমদানি করে না। এলাকার আমদানিকারক ও স্থানীয় সংগ্রহকারীদের কাছ থেকেই তারা কাপড় কেনেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা তাদের ক্রেতা। এভাবে ইসলামপুরের পণ্য পৌঁছে যায় দেশের ৬৪ জেলাতেই। ঢাকার ভেতরেও বসুন্ধরা সিটি, উত্তরা ও বনানী-গুলশানসহ বড় বাজারগুলোতে রয়েছে তাদের সরবরাহ নেটওয়ার্ক।
ইসলামপুরের বাণিজ্য দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাইকারি দামে কেনা কাপড় অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও যায়। বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় এর চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা মেটাতে এসব পণ্য পৌঁছে যায় মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াতেও।
দামের বৈচিত্র্যও ইসলামপুরের অন্যতম আকর্ষণ। পাইকারি কিংবা খুচরা—বিক্রির ধরন এবং পণ্যের ওপর নির্ভর করে এখানে কাপড়ের দাম শুরু হয় মাত্র ২০ টাকা থেকে। আবার কোনো কোনো পণ্যের দাম কয়েক হাজার টাকা পর্যন্তও ওঠে।
ফারুক জানান, কাপড়ের মান ও ধরন অনুযায়ী প্রতি গজের দাম ২০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি। পাইকারি বাজারে ভালো মানের থ্রিপিসের দাম শুরু হয় ৪৫০-৫০০ টাকা থেকে। শাড়ি ও লুঙ্গির দামও মান ও ধরনের ওপর নির্ভর করে সাধারণ থেকে প্রিমিয়াম পর্যায় পর্যন্ত ওঠানামা করে।
আলী আনসার মোল্লা বলেন, স্থানীয়দের কাছে তিনি শুনেছেন, ব্যবসায়ী সমিতি গঠনের আগে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত সাপ্তাহিক চাঁদা দিতে বাধ্য করা হতো। সেই টাকা কারা নিত, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না। কেউ দিতেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা। তিনি বলেন, এখন এই সমস্যা সমাধানে কাজ করছে ব্যবসায়ী সমিতি। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো ব্যবসায়ীরা যেন চাঁদা না দিয়ে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন। পাশাপাশি ইসলামপুরের পাইকারি বাজারের নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নও আমাদের লক্ষ্য।’
দোকানের ভেতরের ছবিটাও একই গল্প বলে। যৌক্তিক দামের জন্যই ক্রেতারা বারবার ফিরে আসেন ইসলামপুর। ফারুক জানান, তার দোকানে ৩৫০ থেকে ২ হাজার টাকা দামের বিভিন্ন ধরনের থ্রিপিস পাওয়া যায়। তিনি জানান, সব নকশাই যেহেতু তাদের নিজস্ব কারখানায় তৈরি হয়, তাই প্রতিটি নকশাই আলাদা। অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় অনেক কম দামে ক্রেতারা এসব নকশার কাপড় কিনতে পারেন। তবে বদলে যাচ্ছে ইসলামপুরের চিরাচরিত পাইকারি বাণিজ্যের ধরনও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ছোট ই-কমার্স ও সোশ্যাল কমার্স ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে পণ্য কিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন।
বোরহানউদ্দিন বলেন, অনলাইন বিক্রেতারা এখন তার দোকানের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের একটি। তিনি বলেন, ‘এক জায়গায় কম দামে নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায় বলেই তারা আমাদের কাছ থেকে সরাসরি কেনেন।’ তবে এই সমৃদ্ধির ছবির আড়ালেও রয়েছে ভিন্ন এক বাস্তবতা। বোরহানউদ্দিন জানান, একসময় তার দোকানে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
কিন্তু ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিক্রি কমে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রতিদিন ১ লাখ টাকার পণ্যও বিক্রি হতো না। তিনি জানান, আগে ক্রেতাদের ভিড় এত বেশি থাকত যে দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি যাওয়ারও সময় পেতেন না।
ঈদে বাড়ে মৌসুমি ব্যস্ততা
সারা বছরই ব্যস্ত থাকে ইসলামপুর। তবে ঈদ ও পূজার আগে বদলে যায় সেই ব্যস্ততার মাত্রা। রমজান শুরুর প্রায় এক মাস আগে থেকেই খুচরা বিক্রেতারা দোকানের জন্য পণ্য তুলতে আসতে শুরু করেন। কাপড় বোঝাই ভ্যান ও রিকশা তখন অবিরাম চলতে থাকে সরু গলিগুলোয়।
ফারুক বলেন, পোশাকের ব্যবসা কিছুটা মৌসুমনির্ভর। ঈদ বা পূজা ঘনিয়ে এলে বিক্রি হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। মৌসুমি ব্যস্ততা শুরু হয় শবে বরাতের সময় থেকে। রমজানের প্রথম সপ্তাহে তা পৌঁছে যায় চূড়ায়। ঈদ্রিস বলেন, চাঁদরাত পর্যন্ত চলে ইসলামপুরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়।
শবে বরাতের ঠিক আগের দিনগুলোতে প্রতিদিন কাপড় বিক্রি হতে পারে ২ লাখ টাকারও বেশি। অথচ সাধারণ সময়ে দৈনিক বিক্রি নেমে আসে প্রায় ৩০ হাজার টাকায়। অল্প সময়ের এই মৌসুমি চাহিদা কতটা তীব্র, তারই চিত্র মেলে এতে।
ঈদ্রিস বলেন, রমজানে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। দোকান রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং সকাল ১০টার মধ্যেই আবার খুলে যায়। আর চাঁদরাতে দোকান চলে সারা রাত।
ঢাকার বাইরের ক্রেতাদের জন্য ইসলামপুরে মৌসুমি কেনাকাটা এখন যেন আলাদা এক রুটিন। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের ৫৩ বছর বয়সী হালিমা আক্তার গত ২৫ বছর ধরে ইসলামপুর থেকে কাপড় কিনছেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের জন্য পাইকারি ও গজ কাপড় কিনতে এখানে কতবার এসেছি, তার হিসাবই নেই।’ তার মতে, দাম ও মানের ভালো সমন্বয়ই বারবার তাকে ইসলামপুরে টেনে আনে।
ব্যস্ত বাজারের আড়ালের সংকট
সংকটের শুরুটা আমদানির পর্যায়েই। ডলারের সংকটের কারণে চীন বা ভারত থেকে সুতা ও বিদেশি কাপড় আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছে না। ফলে আমদানিতে তৈরি হচ্ছে বিলম্ব।
এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। এতে আগের তুলনায় কাপড় উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। টেক্সটাইল মিল ও ডাইং কারখানায় নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় এই উৎপাদন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না।
বাড়তি খরচের এই চাপ গিয়ে পড়ছে বিক্রিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের পোশাক কেনার বাজেটও কমেছে। ফলে খুচরা বিক্রেতারাও আগের মতো বিপুল পরিমাণে ইসলামপুর থেকে পাইকারি পণ্য কিনছেন না।
ফারুক জানান, ১০ বছর আগে তার দোকানে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়। অথচ দৈনিক খরচই ১০ হাজার টাকার বেশি। বিক্রি কমে যাওয়া ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের একমাত্র চাপ নয়। অনেকে বলছেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা আদায়ের একটি ব্যবস্থাও এখনো চালু রয়েছে। ফারুক বলেন, চাঁদাবাজির সেই ব্যবস্থা এখনো চলছে। তিনি বলেন, ‘কে আপনি, তার ওপর নির্ভর করে।’ তিনি বলেন, ‘ফুটপাতে ছোট ব্যবসা করা বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। পণ্য নিয়ে আসা ট্রাকগুলোকে লোডিং খরচের নামে প্রতি ট্রিপে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হয়। আর আমাদের মতো বড় দোকানগুলোর কাছে সপ্তাহে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা চাওয়া হয়।’
ক্রেতা কমে যাওয়ার এই সংকটের সঙ্গে ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের সামনে এখন আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী—অনলাইন ব্যবসা। অনেকেই এখন সরাসরি অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসা করছেন। ঘরে বসেই চলছে এসব ব্যবসা। শোরুমের ভাড়া বা বাড়তি করের মতো খরচ না থাকায় তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন। এতে ইসলামপুরের দোকানিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে।
বোরহানউদ্দিন জানান, বাড়তি খরচ কম থাকায় অনলাইন বিক্রেতারা অনেক সময় বেশি মুনাফা করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাম এমনিতেই যৌক্তিক। এটাই আমাদের প্রতিযোগিতা—আমি যদি ৫ টাকা কমাই, অন্যজন আরও ৫ টাকা কমিয়ে দেয়।’ তিনি আরও জানান, ২০২১ সালের শেষ দিকে হিসাব করতে গিয়ে দেখেন, প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এখনো তার কাছে পাওনা রয়েছে। সেই বাকি টাকা আজও পুরোপুরি আদায় করতে পারেননি তিনি।
নকশা নকল করাও ইসলামপুরের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের আরেক সমস্যা। কোনো ব্যবসায়ী নতুন কোনো থ্রিপিস বা শাড়ির নকশা বাজারে আনলে ছোট কারখানাগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই তা নকল করে তৈরি করতে পারে। অপেক্ষাকৃত সস্তা ও নিম্নমানের কাপড় ব্যবহার করে কম দামে সেই নকশা বাজারে ছাড়া হয়। ফলে নতুন নকশা তৈরির খরচ বহন করা মূল ব্যবসায়ীকে, আর কম দামে নকল পণ্য বিক্রি করে লাভ করে প্রতিযোগীরা।
প্রায় ৩০০ বছরের ইতিহাসে ইসলামপুর বহুবার বদলেছে। আমের আড়ত থেকে কাপড়ের সাম্রাজ্য, টিনের চালের গুদাম-দোকান থেকে বহুতল ভবন, কাঠের বাক্সে রাখা হিসাবের খাতা থেকে অনলাইন অর্ডার—সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে এর রূপ। আর প্রতিটি পরিবর্তনই এসেছে সেই সময়ের প্রয়োজন থেকে।
আজকের সংকট—ডলারের অভাব, নকশা চুরি কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা হয়তো একদিন ইসলামপুরের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রবাহেই মিশে যাবে। তাই ফারুক হোসাইনের মতো ব্যবসায়ীরা এখনো আশা ছাড়েননি। তিনি বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে যা শিখেছি, এখন ছেলেকে তা শেখাচ্ছি। ব্যবসা আছে, ব্যবসা থাকবেও—শুধু এর ধরন বদলাবে।’