প্রভাত ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের মধ্যেই যৌথ ঘোষণা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো। ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা জানিয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরতে একমত হয়েছেন নেতারা। কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে এমন ভাষায় ঐকমত্যে পৌঁছানোকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। খবর এনডিটিভির।
শুক্রবার থেকে নয়া দিল্লিতে শুরু হওয়া ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন চলবে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সম্মেলনের মূল আয়োজন হচ্ছে ভারত মণ্ডপমে। ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও গ্লোবাল সাউথের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় এসেছে।
শনিবার সম্মেলনের আবহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ছবি ঘিরে। ছবিতে মোদীকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হাত ধরে থাকতে দেখা যায়। একই ছবিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোকেও দেখা যায়। ছবিটি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করে মোদী লিখেছেন, ‘BRICS Summit 2026 gets underway in Delhi’।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন শুক্রবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়া দিল্লিতে আসেন আজ শনিবার। ব্রিকস সম্মেলনের আগে মোদীর সঙ্গে পুতিনের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও হয়। বৈঠকের পর দুই নেতা একই গাড়িতে করে ভারত মণ্ডপমে যান—যে দৃশ্যটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
ব্রিকসের যৌথ ঘোষণা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইরানসহ বিভিন্ন সদস্য দেশের অবস্থানে পার্থক্য থাকায় অভিন্ন ভাষা ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘ ও তীব্র আলোচনার পর নেতারা ‘দিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণে সম্মত হন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভোর পর্যন্ত আলোচনা চলার পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বনেতাদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়। এর আগে মে মাসে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মতপার্থক্যের কারণে যৌথ ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এবার নেতাদের একটি অভিন্ন ঘোষণায় রাজি করানো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যৌথ ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়ে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা এবং সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সম্মেলনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গ্লোবাল সাউথের নীতিনির্ধারকদের বৈশ্বিক আলোচনায় কার্যকরভাবে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ দিতে ভারত প্রস্তুত।
ভারত এবারের ব্রিকস সভাপতিত্বে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর সুযোগ তৈরির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
মোদী ব্রিকসকে শুধু একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন। ব্রিকস বিজনেস ফোরামে তিনি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাধা কমানো, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তৈরির আহ্বান জানান।
সম্মেলনের আগে শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদী। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। রাশিয়া-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে রুশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে এনডিটিভি।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক: শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে নয়া দিল্লিতে পৌঁছান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সাত বছর পর এটি তার প্রথম ভারত সফর। সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারত-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে দুই নেতার আলোচনার দিকে নজর রয়েছে। দিল্লিতে একই মঞ্চে মোদী, পুতিন ও শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি এবারের ব্রিকস সম্মেলনের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও তুলে ধরছে।
শুক্রবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন মোদী। বৈঠকে ভারত-ইরান সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতি গুরুত্ব পায়।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তায় পড়ায় ভারত এ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দিল্লি নিরাপদে জ্বালানি বহনকারী জাহাজ চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংকটের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়ে আসছে।
ব্রিকসের বিস্তৃত সদস্যপদ এবং সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ঘোষণা তৈরি করা বরাবরই কঠিন। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে মতপার্থক্য আরও প্রকট। সেই বাস্তবতায় দীর্ঘ আলোচনার পর দিল্লি ঘোষণায় নির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী না করে ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা এবং সংলাপ-কূটনীতিকে সমাধানের পথ হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থানের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি হয়েছে।