প্রভাত ডেস্ক: টানা তৃতীয় দিনের মতো সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তাদের বাহিনী হুতিদের ছোড়া আরও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি রিয়াদ লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল।
গত কয়েক দিনে রিয়াদে একের পর এক হামলা হয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। হামলার ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করছে রিয়াদ। সৌদি জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানান।
তুর্কি আল-মালিকি বলেন, হুতিরা রিয়াদ লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তিনি বলেন, তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই ‘শনাক্ত ও ধ্বংস’ করা হয়েছে।
এদিকে গত রাতে রিয়াদের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে আকাশপথে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এর কিছুক্ষণ পরই শহরে কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ বেশির ভাগ জনবহুল এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা হুতিরা জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, ইয়েমেনের সীমান্তসংলগ্ন সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের একটি সামরিক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো ও যাত্রীদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ও যাতায়াত না করতে আবারও সতর্ক করে দিয়েছেন ইয়াহিয়া সারি। তিনি বলেন, ‘পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা সতর্কতার বাইরে থাকবে। তবে অন্য শহরের বিমানবন্দরগুলো নিরাপদ নয়।’
নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার খবর এমন সময় পাওয়া গেল, যখন কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ আছে। গত শনিবার বিমানবন্দরটিতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।
এ ঘটনার পরপর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। গত রোববার সেখানে আবারও হামলা চালায় হুতিরা। নিহত হন একজন, আহত হন ১১ জন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বিভিন্ন এয়ারলাইনস এরই মধ্যে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রেখেছে।
হুতিরা বিমানবন্দরের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোয় একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিন লড়াই চলছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিচ্ছে তারা। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক হামলাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই এ সংঘাত নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে।
রিয়াদে একটি জ্বালানি সম্মেলনে অংশ নিয়ে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেন, গত সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হামলার ঘটনাগুলো সৌদি আরবের সহনশীলতা ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।
জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমান গুরুত্বের হতে হবে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনীতি বহুমুখীকরণ পরিকল্পনা বা ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখতে হবে। বিনিয়োগও চালিয়ে নিতে হবে।’
হুতিদের হামলার জবাব দেওয়ার পথ খুঁজছে সৌদি আরব, কিন্তু কৌশল কী হবে
নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে পারেনি, তা তদন্ত করে দেখছে সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এ তথ্য জানিয়েছেন আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা এ কথা বলেন।
প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হুতিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন ছোড়ে। এর মাধ্যমে তারা ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার পথ পরিষ্কার করে। পরে ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দরে আঘাত হানে বলে জানান ওই কর্মকর্তারা।
হুতিদের হাতে এমন সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড মাঝ আকাশে দিক পরিবর্তন করতে পারে। এতে সৌদি আরবের হাতে থাকা প্যাট্রিয়টসহ অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সেগুলো প্রতিহত করা কঠিন।
প্রায় এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রিয়াদে পৌঁছালেও কেন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগেভাগে সতর্কবার্তা দিতে পারেনি—সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা। সৌদি আরবে হামলার ঘটনায় হুতিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝেড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও। তবে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
হুতিদের বিষয়ে কী কী করার পরিকল্পনা করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে হুতিরা খুবই খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো না।’ হুতিদের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ সংঘাতে জড়ালে সেটার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।