• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৪ অপরাহ্ন
Headline
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ সামলাতে একা ভ্রমণেই প্রশান্তি: বাঁধা নিয়ম ভেঙে নিজেকে খুঁজে পাওয়া অপরাধস্থলের প্রতিটি চিহ্নের পেছনে যে গল্প ব্রিটিশরা ভারতীয়দের বহু কৃতিত্ব ও সম্পদ নিজেদের পকেটে পুরেছে প্রকাশনা সংস্থায় গোপনে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার: ক্ষুব্ধ কর্মীরা নবীনগরে সাংবাদিকদের গাড়ি আটকে ইজারার নামে চাঁদা দাবি , সংসদ সদস্যের দুঃখ প্রকাশ পুলিশের জন্য ৫৮৩০টি যানবাহন কেনার প্রস্তাব, ব্যয় হবে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ফ্রান্সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা মেসিনা প্রণালি পার হতে ইতালির এই ট্রেনকে ফেরিতে তোলা হয় একই খাবারে বারবার চুবিয়ে খাওয়া কি অস্বাস্থ্যকর? বারবার পপ-আপ বিজ্ঞাপনে বিরক্ত? বন্ধ করবেন যেভাবে
আঙুলের ছাপ শনাক্ত করার ইতিহাস

ব্রিটিশরা ভারতীয়দের বহু কৃতিত্ব ও সম্পদ নিজেদের পকেটে পুরেছে

Reporter Name / ১৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

রকমারি ডেস্ক: আঙুলের ছাপ শনাক্ত করার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বঞ্চনার ইতিহাস। দখলদার ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ভারতীয়দের বহু কৃতিত্ব ও সম্পদ নিজেদের পকেটে পুরেছে। আরও অনেক কিছুর মতোই, আজিজুল হকের আবিষ্কারের কৃতিত্বও চুরি করেছিলেন স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি নামের এক ব্রিটিশ।
১৯১০ সালে শিকাগোয় খুনের এক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আঙুলের ছাপকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের করে। এর মধ্য দিয়ে আঙুল ছাপকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার প্রথম নজির তৈরি হলো।
১৯১০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে একটু অস্বস্তি নিয়ে ঘুম ভাঙল মেরি হিলারের। শিকাগোর এ বাড়িতে তিনি স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে থাকেন। রোজ রাতে সিঁড়ির মাথায় গ্যাসের যে বাতিটি রাতে জ্বালিয়ে রাখেন। বাতিটি সেদিন নিভে গিয়েছিল। হয়ত এ কারণেই অস্বস্তি। কী হলো? দেখতে স্বামী ক্ল্যারেন্স হিলারকে ঘুম থেকে তুলে পাঠালেন তিনি।
বাতিটি দেখতে গিয়ে ক্ল্যারেন্সের মুখোমুখি হলেন এক আগন্তুকের। না বলে কয়ে বাড়িতে ঢুকছে সে। লোকটির নাম থমাস জেনিংস। সম্প্রতি প্যারোলে মুক্তি পেয়েছে। জেনিংস ও ক্ল্যারেন্সের মধ্যে অল্প সময় চলল হাতাহাতি। এরপরই শোনা গেল কয়েকটি গুলির শব্দ । মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ক্ল্যারেন্স। প্রায় সাথে সাথে প্রাণ হারালেন। এ খুন করার আগে জেনিংস হিলারের এক মেয়েকে যৌন নিপীড়নও করেছিল।
ঘটনার পর পরই ভাগল জেনিংস। পার পেলো না। অকুস্থল থেকে এক মাইলেরও কম দূরত্বে পুলিশ হাতে ধরা পড়তে হলো। তার শরীরে তখনও রক্তের দাগ। পোশাক-আশাক ছেঁড়া। একই সাথে পাওয়া গেল .৩৮ ক্যালিবারের রিভলভার। আগ্নেয়াস্ত্রসহ সম্প্রতি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রমাণ মিলল। পোশাক ছেঁড়া ও এমন অবস্থায় থাকার ব্যাখ্যা দিতে কসুর করেনি জেনিংস। বলল, একটা ট্রলি থেকে পড়ে তার এ দশা। পুলিশ তো আর দুধ ভাত খায় না। তার কথাকে বিশ্বাস করার মতো মনে হলো না। গ্রেফতার এড়াতে পারল না জেনিংস। সোজা চালান করে দিল।
তবে শুধু এসব আলামত কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই কেবল জেনিংসের মৃত্যুদণ্ড দেয়নি আদালত। আরো কারণ ছিল। হিলারদের বাড়ির পেছনের বারান্দার সদ্য রং করা একটি রেলিংয়ে পাওয়া যায় তার আঙুলের ছাপ। জেনিংসকে খুনি হিসেবে শনাক্ত করতে এই ছাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মানুষকে শনাক্ত করতে আঙুলের ছাপ ব্যবহারের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে পরিচয় শনাক্ত করার জন্য এর প্রথম ব্যবহার সম্ভবত শুরু হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতে। ১৮৬০ সালের দিকে ব্রিটিশ ভারতের সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা স্যার উইলিয়াম জেমস হার্শেল চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিকল্প হিসেবে আঙুল ও হাতের ছাপ ব্যবহারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
১৮৭০ ও ১৮৮০-এর দশকে জাপানে কর্মরত স্কটিশ চিকিৎসা মিশনারি হেনরি ফিল্ডস আঙুলের ছাপ নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে অপরাধ তদন্তে এর ব্যবহার কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে তিনি ভাবনা শুরু করেন। এ বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রকাশিত চিন্তাভাবনা ১৮৮০ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়।
ফল্ডস নিজের ধারণাগুলো চিঠির মাধ্যমে চার্লস ডারউইনকে জানান। ডারউইন সেগুলো তাঁর আত্মীয় নৃবিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটনের কাছে পাঠান। পরে গ্যালটন আঙুলের ছাপ নিয়ে তিনটি বই প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১৮৯২ সালে প্রকাশিত ফিঙ্গার প্রিন্টস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গ্যালটন ইউজেনিকস বা বংশগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মানুষের বাছাই ও প্রজনন নিয়ন্ত্রণের বিতর্কিত তত্ত্বের জন্যও কুখ্যাত। ইউজেনিকস বলতে বোঝায়, বংশগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মানুষের প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করে কথিত ‘উন্নত’ বৈশিষ্ট্যের মানুষের সংখ্যা বাড়ানো এবং ‘অনাকাক্সিক্ষত’ বৈশিষ্ট্যের মানুষের সংখ্যা কমানোর ধারণা। উনিশ শতকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস গ্যালটন এই তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। তাঁর ধারণা ছিল, মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বংশগতভাবে নির্ধারিত হয় এবং বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে মানবজাতির বৈশিষ্ট্য উন্নত করা সম্ভব। পরবর্তী সময়ে এই ধারণা বর্ণবাদ, প্রতিবন্ধী ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য এবং জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণের মতো নীতির পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে আঙুলের ছাপের রেখার ধরন শনাক্ত করার একটি মৌলিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে গ্যালটনের অবদান ছিল। এই পদ্ধতিতে রেখার ধরনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়,আর্চ বা খিলান, লুপ বা বক্ররেখা এবং হোয়ার্ল বা ঘূর্ণি। আজও মানুষের পরিচয় শনাক্ত করতে এই শ্রেণিবিন্যাস ব্যবহৃত হয়। পরে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রধান কমিশনার স্যার এডওয়ার্ড হেনরি এই পদ্ধতিকে মানসম্মত রূপ দেন। গ্যালটন-হেনরি পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম ১৯০০ সালে প্রকাশিত হয়। পরের বছর, ১৯০১ সালে, লন্ডনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড অপরাধীদের রেকর্ড সংরক্ষণের কাজে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্ধতিটি গ্রহণ করে। অথচ এ কাজের মূল কাজি ছিলেন আজিজুল হক। ২০২১ সালে ২৭ ডিসেম্বর টিবিএসে প্রকাশিত মারুফ হোসেনের ‘আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ পদ্ধতি: ‘বাংলাদেশি’ আজিজুল হকের বেহাত কৃতিত্ব’ শীর্ষক ফিচারে ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া এ নায়ককে তার পরিচয়সহ তুলে ধরা হয় সে কথায় আসছি, একটু সবুর করতে হবে। এর এক দশকও পার হয়নি, এমন সময় হিলারদের বাড়িতে খুনের ঘটনা ঘটে। বাড়িতে ঢোকার আগে জেনিংস পেছনের বারান্দার সদ্য রং করা রেলিংয়ে নিজের চারটি আঙুলের ছাপ রেখে যায়। রেলিং ধরে শরীর ওপরে তুলে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিল খুনি জেনিংস।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন সকালে তদন্তকারীরা রেলিংটি খুলে নিয়ে যান। সেখানে পাওয়া আঙুলের ছাপগুলোর বড় আকারের ছবি তোলা হয়। এরপর সেগুলোর সাথে আরো দুই সেট আঙুলের ছাপের তুলনা করা হয়। একটি সেট নেয়া হয়েছিল জেনিংসকে গ্রেপ্তারের সময়। অন্য সেটটি কয়েক মাস আগে নেয়া হয়েছিল, সে সময় প্যারোলের শর্ত ভাঙার দায়ে তাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
১৯১০ সালের নভেম্বরে জেনিংসের বিচার শুরু হওয়ার সময়। যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধীদের রেকর্ড রাখা এবং কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজে আঙুলের ছাপের ব্যবহার বেশ চালু হয়ে উঠেছিল ১৯১০ সাল থেকেই। একই বছর নভেম্বরে জেনিংসের বিচার শুরু হলা। তবে আদালতে, বিশেষ করে হত্যা মামলায়, হাতের ছাপকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরার নজির তখনো তেমন ছিলই না।
১৯২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট প্রথমে তাদের নারী কর্মীদের আঙুলের ছাপ নেওয়া শুরু করে। জেনিংসের বিচারে আঙুলের ছাপ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চারজনের সাক্ষ্য নেয়া হলো। তাঁরা হলেন শিকাগো পুলিশ বিভাগের তদন্ত ব্যুরোর প্রধান মাইকেল পি. ইভান্স, ওই একই ব্যুরোর সাবেক সদস্য উইলিয়াম এম. ইভান্স, কানাডার পুলিশ পরিদর্শক এডওয়ার্ড ফস্টার এবং আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ বিষয়ে প্রথম নারী প্রশিক্ষক মেরি হল্যান্ড।
চারজনই ব্যক্তিগতভাবে হাজার হাজার আঙুলের ছাপ পরীক্ষা ও সংগ্রহ করেছিলেন। আদালতে তাঁরা আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ পদ্ধতির মৌলিক বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। বিচারে উপস্থাপিত বিভিন্ন সেটের আঙুলের ছাপ যে একই ব্যক্তি রেখে গেছে। অর্থাৎ আসামি জেনিংসের আঙুল থেকে এসেছে এসব ছাপ, সে বিষয়েও প্রত্যেকে সাক্ষ্য দেন।
জেনিংসের বিরুদ্ধে অন্য প্রমাণও ছিল। তাঁর শরীরে আঘাতে চিহ্ন। এ ছাড়া, ঘটনার সময় তিনি কোথায় ছিলেন, সে বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য অন্য সাক্ষীদের দেওয়া তথ্যে সাথে মোটেও মিলছিল না। অপরাধস্থলে পাওয়া গুলির সাথে তাঁর রিভলভারের গুলির মিল পাওয়া যায়। এমনকি তাঁর জুতায় লেগে থাকা মাটির সাথে হিলারের মেয়ের বিছানায় পাওয়া মাটিরও মিল ছিল।
১৯১০ সালের ১০ নভেম্বর জুরিবোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে জেনিংসকে খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। তবে প্রথম দফায় জুরি বোর্ডের একজন সদস্য মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে মত দেননি। তৃতীয় দফায় ভোটাভুটির ফলাফল সর্ব সম্মতিক্রমে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেই যায়।
জেনিংসের আইনজীবীরা রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, আঙুলের ছাপকে আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় কি না এবং এ বিষয়ে পরীক্ষাকারীদের বিশেষজ্ঞ সাক্ষী হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক কি না। ১৯১১ সালে মামলাটি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়। সেখানেও দণ্ডাদেশ বহাল রাখা হলো। আদালত মনে করে, আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণ একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।
পুলিশ জেনিংসের আঙুলের ছাপ নেয়ার সময় তাঁর অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে এই যুক্তি তুলে ধরে তাঁর আইনজীবীরা। হেবিয়াস কর্পাস আবেদনও করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একটি জেলা আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। জেনিংসের জীবনের শেষ দিন। সে দিনই তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আঙুলের ছাপের প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম অপরাধী হিসেবে জেনিংসকে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন আদালত পিপল বনাম জেনিংস মামলার রায়কে নজির হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় আঙুলের ছাপের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের পথ আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তবে গত এক শতাব্দীতে আঙুলের ছাপের বিশ্লেষণ সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল প্রমাণিত হয়নি। তা সত্ত্বেও অপরাধ তদন্তে এর গুরুত্ব রয়ে গেছে। আধুনিক নানা প্রযুক্তি ও কৌশলের বিকাশ ঘটলেও ফরেনসিক তদন্তে আঙুলের ছাপ এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আঙুলের ছাপ দিয়ে মানুষ শনাক্ত পদ্ধতি বের করার সাথে জড়িয়ে রয়েছে আজিজুল হকের নাম। এই বাঙালির আবিষ্কৃত পদ্ধতি আজ গোটা বিশ্বে স্বীকৃত, সমাদৃত। নিখুঁতভাবে অপরাধী শনাক্ত করার পথে বহু বছর পিছিয়ে থাকতে হতো আজিজুল হকের এই আবিষ্কার না হলে। অথচ মহা-তাৎপর্যপূর্ণ এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব তিনি পাননি।
আঙুলের ছাপ শনাক্ত করার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক বঞ্চনার ইতিহাস। দখলদার ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ভারতীয়দের বহু কৃতিত্ব ও সম্পদ নিজেদের পকেটে পুরেছে। আরও অনেক কিছুর মতোই, আজিজুল হকের আবিষ্কারের কৃতিত্বও চুরি করেছিলেন স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি নামের এক ব্রিটিশ।
খান, বাহাদুর কাজী আজিজুল হকের জন্ম ১৮৭২ সালে, তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) খুলনা জেলার ফুলতলার পয়গ্রাম কসবায়। শৈশবেই আজিজুল বাবা-মাকে হারান এক নৌকা দুর্ঘটনায়। বাবাকে হারিয়ে ভীষণ অর্থকষ্টে পড়ে তার পরিবার। পরিবারের দায়িত্ব বর্তায় আজিজুলের বড়ভাইয়ের কাঁধে।
আজিজুল ছিলেন দারুণ মেধাবী। ছোটোবেলা থেকেই কঠিন সব গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলতেন অনায়াসে। তিনি আবার ভোজনরসিকও ছিলেন। জীবনে দুটো জিনিস সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন আজিজুল হক—গণিত আর খাবার।
একদিন প্রচণ্ড গরমে হাড়ভাঙা খাটুনির পর শ্রান্ত দেহে বাড়ি ফিরে তার বড় ভাই দেখেন, ছোট ভাই তার অংশের খাবারও বেশ খানিকটা খেয়ে ফেলেছেন। প্রচণ্ড রাগে ভাইকে পেটালেন তিনি।
মার খেয়ে অপমানে, অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ছেড়ে পালাল আজিজুল। ট্রেপে চেপে চলে গেল কলকাতায়। ১৮৮৪ সালে ১২ বছরের বালক আজিজুল পা রাখে মহানগরী কলকাতায়। ঘটনাক্রমে ঠাঁই মেলে এক বাঙালি বাবুর বাড়িতে। মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়ার পর লেখাপড়ার প্রতি আগের আগ্রহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে মেধাবী আজিজুলের। তাই বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য শিক্ষকরা এলে গুটিসুটি হয়ে কাছেপিঠে বসে পড়ত বালক আজিজুলও। শুনে শুনে অনেক কিছু শিখে নেয় সে। একসময় দেখা গেল, যে-সব অঙ্কের সমাধান করতে বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা হিমশিম খাচ্ছে, আজিজুল ওসবের সমাধান করে দিচ্ছে চোখের পলকে। গৃহকর্তা যখন দেখলেন আসলেই এ ছেলে দারুণ মেধাবী। তাই তিনি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন আজিজুলকে। স্কুলের পাট চুকিয়ে ভর্তি হলো প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে গিয়ে গণিত ও বিজ্ঞানে দারুণ ফল করলেন। নিজের মেধা ও পরিশ্রমের জোরে প্রিন্সিপাল ও অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হলেন বাড়ি থেকে পালানো আজিজুল। হয়ে উঠলেন সহপাঠীদের সমীহের পাত্র।
১৮৯২ সালে বেঙ্গল পুলিশের মহাপরিদর্শক স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি এক চিঠি পাঠালেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে। তাতে বললেন, পরিসংখ্যানে খুব ভালো, এমন ছাত্র যেন তার কাছে পাঠানো হয়। তার অধীনে তাদেরকে পুলিশ বাহিনীতে চাকরি দেবেন। চিঠি পেয়েই প্রিন্সিপাল ঝটপট আজিজুল ও হেমচন্দ্র বসু নামে আরেক ছাত্রকে সুপারিশ করলেন। ফলে স্যার হেনরির মাধ্যমে পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর হিসেবে চাকরি পেয়ে গেলেন আজিজুল ও হেমচন্দ্র।
আঙুলের ছাপের সাহায্যে অপরাধী শনাক্তকরণের পদ্ধতি আবিষ্কারের মূল কাজটি করেছেন আজিজুল হক। কিন্তু কাজের পুরো কৃতিত্ব নিজের পকেটে পুরে নিলেন স্যার হেনরি। এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয় তারই নামে—’হেনরি সিস্টেম’। অনেকে অবশ্য বলেন যে, এই পদ্ধতির মূল ধারণা যেহেতু স্যার হেনরির মাথা থেকে এসেছে, তাই সিংহভাগ কৃতিত্বের দাবিদারও তিনিই। কিন্তু এ কাজের উদ্ভাবনী চিন্তার পরিচয় দিয়ে মূল পরিশ্রম যে আজিজুল করেছেন, এ কথাও তো সত্য। অথচ স্যার হেনরি তার ‘ক্লাসিফিকেশন অ্যান্ড ইউজেস অব ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বইয়ে বেমালুম চেপে যান আজিজুল হকের নাম।
যাহোক, হেনরি সিস্টেম গড়ে তোলার অল্প দিন পরেই কলকাতায় স্থাপিত হয় বিশ্বের প্রথম ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো। এই সংস্থা প্রতিষ্ঠার অনেক পর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে একই ধরনের আরও একটি ব্যুরো গড়ে তোলা হয়। পরে আমেরিকাতেও স্থাপন করা হয় একই ধরনের প্রতিষ্ঠান। এখন বিশ্বের সব দেশেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আজিজুল হকের আবিষ্কৃত আঙুলের ছাপের শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
স্যার হেনরি পুরো কৃতিত্ব নিজের পকেটে পুরলেও, ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে অনুসন্ধিৎসু গবেষকরা ঠিকই বের করে এনেছেন আঙুলের ছাপের সাহায্যে পরিচয় শনাক্তকরণ পদ্ধতির মূল আবিষ্কারককে। ‘কারেন্ট সায়েন্স।’ সাময়িকীর ২০০৫ সালের ১০ জানুয়ারি সংখ্যায় জিএস সোধী ও যশজিৎ কউর ‘দ্য ফরগটেন ইন্ডিয়ান পাওয়ারস অভ ফিঙ্গারপ্রিন্ট সায়েন্স’ নামে এক নিবন্ধ লেখেন। ওই নিবন্ধে তারা হাতের ছাপ অব আজিজুল হকের অবদানের কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করেছেন।
আজিজুলের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে অবিভক্ত ভারতের চম্পারানে (বর্তমান বিহার রাজ্যের উত্তর চম্পারান জেলা)। সেখানেই ১৯৩৫ সালে মারা যান তিনি। বিহারের মতিহারি স্টেশনের অনতিদূরে নিজের বাড়ি আজিজ মঞ্জিলের সীমানাতেই তাকে কবর দেওয়া হয়। দেশভাগের পর আজিজুলের পরিবারের অন্য সদস্যরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। আজিজুলের উত্তরসূরিরা বর্তমানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category