প্রভাত ডেস্ক: ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মঙ্গলবারের নির্বাচনে বুথফেরত জরিপে কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা জোট সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এখন কী হবে? কীভাবে গড়া হবে দেশটির নতুন সরকার?
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল টুয়েলভের বরাতে আল–জাজিরার খবরে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫২টি আসনে জিতেছে। আর সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টিতে জিতেছে। আরব লিস্ট জিতেছে ১৯টি আসনে।
এ অবস্থায় ১২০ আসনের নেসেটে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১ আসন) নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলাফল হিসেবে ইসরায়েলে পরবর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দর–কষাকষির পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো অভাবনীয় ফল করেছে। এসব দল কোনো জোটেরই অংশ নয়। অন্য দলগুলো যদি তাদের সঙ্গে জোট গড়তে রাজি হয়, তবে তারা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়কের ভূমিকা পালনকারী বা ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারে।
গাদি আইজেনকট বলেন, নেতানিয়াহুর প্রতি যে মানুষের ‘আস্থার সংকট’ রয়েছে, সেটা বুথফেরত জরিপে স্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জোট ‘শোচনীয় পরাজয়ের’ মুখোমুখি হয়েছে। মানুষ তাদের ঘরে ফিরে যেতে বলেছে।
বিরোধীপক্ষের এমন কথাকে ‘আগাম উদ্যাপন’ বলে মন্তব্য করেছেন গিদিয়ন সার। তিনি ইসরায়েলের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির রাজনীতিবিদ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে গিদিয়ন সার লেখেন, ‘লিকুদ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া সব সময়ের জন্যই ভালো।’
লিকুদ পার্টির নেতা নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। গত তিন দশকে নানা রাজনৈতিক সংকট সামলে ক্ষমতার কেন্দ্রে টিকে আছেন তিনি। বুধবার জেরুজালেমে জড়ো হওয়া নিজ দলের সমর্থকদের উদ্দেশে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লিকুদ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমরা একটি শক্তিশালী নতুন জাতীয় সরকার গড়ব।’
ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এহাব জাবারিন বলেন, বুথফেরত জরিপগুলোয় নেতানিয়াহুর জোটের ‘স্পষ্ট দুর্বলতা’ উঠে এসেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘নেতানিয়াহু চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছেন কিংবা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটেছে—কোনোটা বলার সময়ই এখনো আসেনি।’
এহাব জাবারিন আরও বলেন, ‘একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় যদি কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারে, তবে আলোচনা চলাকালে নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন।’এখন দেখার বিষয়, ইসরায়েলে কী ঘটে।
ইসরায়েলের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে আগামী ৪ নভেম্বর। এরপর ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ডেকে আলোচনায় বসবেন। জানতে চাইবেন, তাঁরা কাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। এরপর প্রেসিডেন্ট এমন এক প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানাবেন, যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে তিনি মনে করবেন। সেই ব্যক্তি যে নেসেটে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেতাই হবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের দল সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। তাই এ দুজনকেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর ওই নেতা সর্বোচ্চ ৪২ দিন সময় পাবেন। শুরুতে ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে। তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে এ সময় আরও ১৪ দিন বৃদ্ধি করতে পারেন।
এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দল নিজেদের নীতিগত দাবি আদায় বা মন্ত্রীর পদ পাওয়া নিয়ে আলোচনা ও দর–কষাকষি করবে। (প্রধানমন্ত্রী পদে) মনোনীত প্রার্থী সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করার চেষ্টা করবেন।
যদি কোনো প্রার্থী নেসেটে ৬১টি আসন নিয়ে জোট গঠন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি ছোট দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের শর্তে ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতাও হতে পারে।
নতুন সরকারকে শপথ নিতে হলে পার্লামেন্টে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আস্থা ভোটে জয়ী হতে হবে। কিছু দলের ভোটদানে বিরত থাকার সাপেক্ষে ৬১টির কম ভোট পেলেও সরকার গঠন করা সম্ভব হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট যাঁকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন, তিনি ব্যর্থ হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট নেসেটের অন্য আরেকজন সদস্যকে নতুন করে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন। তিনিও নিয়ম মেনে ২৮ দিন সময় পাবেন।
নতুন মনোনীয়ত এই প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবেন। ওই ব্যক্তিকে সরকার গড়তে ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে। এরপরও যদি অচলাবস্থা বজায় থাকে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে। ইসরায়েলে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
৯০ দিনের মধ্যে এ নির্বাচন হতে হবে। এ সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ চালাবে। এ সরকারের প্রধান হবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। নিয়ম অনুযায়ী, নেতানিয়াহু হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান।
হ্যাঁ, ঘটেছিল। নেসেটে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চের মধ্যে ইসরায়েলিদের তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে হয়েছিল। এর ফলে নেতানিয়াহু এবং তাঁর তৎকালীন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তাঁদের পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু বাজেট পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় এক বছর পর সেই জোট সরকার ভেঙে যায়।