প্রভাত অর্থনীতি: বিগত কয়েক বছর কোরবানির পশুর বাজারে শেষ সময়ে দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকতেন বিক্রেতারা। তবে এবার সেই উদ্বেগ অনেকটাই কম। সীমান্তঘেঁষা হাটগুলো বন্ধ থাকা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরু পরিবহনে কড়াকড়ির ফলে বাজারে ভারতীয় পশুর প্রবেশ কমে গেছে। অন্যদিকে, দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে বড় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় খুব বেশি বাড়েনি। ফলে এবার বাজারে পশুর দাম কমার সম্ভাবনা কম, বরং ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন খামারি ও ব্যাপারীরা।
রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশান ঘাট সংলগ্ন পশুর হাটে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে এসেছেন মনিরুল মিয়া। তার আনা ২৬টি গরুর মধ্যে ১১টি নিজের খামারের, বাকিগুলো অন্যদের কাছ থেকে কেনা। মনিরুল বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় আগের মতো ভারতীয় গরু ঢুকছে না। আবার দেশে বড় বড় কিছু খামারও বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বাজারে এবার পশুর চাপ খুব বেশি হবে না বলেই মনে হচ্ছে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা ছিল। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে কোরবানির সংখ্যা বাড়তে পারে, যা বাজারে চাহিদা বাড়াবে বলে তাদের ধারণা।
খামারিদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা অনেক বড় খামার এবার আর সক্রিয় নেই। যেসব খামার প্রতি বছর শত শত পশু সরবরাহ করত, তার অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এবার ছোট ও মাঝারি খামারিদের পশুর চাহিদা বেশি থাকবে। বাজারে পশুর কোনো ঘাটতি না থাকলেও অতিরিক্ত সরবরাহ হবে না—এমন হিসাব থেকেই ভালো দামের প্রত্যাশা করছেন তারা।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার গরু পরিবহনে কড়াকড়ি আরোপ করায় এবং বাংলাদেশ সরকার সীমান্তসংলগ্ন পশুর হাটের অনুমোদন না দেওয়ায় বাজার এখন প্রায় পুরোপুরি দেশীয় পশুর ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অবিক্রীত পশুর সংখ্যা এবার কম থাকবে এবং শেষ সময়ে চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে অনেকেই আগেভাগেই রাজধানীর হাটে পশু নিয়ে আসতে শুরু করেছেন।
আগামী ২৮ মে দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী হাটগুলো ঈদের পাঁচ দিন আগে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন নির্ধারিত স্থানে ইতিমধ্যে গরুর ট্রাক আসতে শুরু করেছে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, যশোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা দলবেঁধে পশু নিয়ে আসছেন। কমলাপুর এলাকার বিভিন্ন সড়কে ইতিমধ্যে বাঁশের ঘেরা তৈরি করে গরু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
যশোরের মনিরামপুর থেকে আসা বিক্রেতা মহিন ব্যাপারী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বেশ কয়েকটি বড় খামার বন্ধ হয়ে গেছে, যেগুলোর প্রতিটিতে ২০০ থেকে ৩০০ গরু থাকত। গত কয়েক বছর ব্যবসা ভালো না হলেও এবার পরিস্থিতি বদলাবে বলে আশা করছি।’ মহিন ও তার সঙ্গীরা মিলে এবার ৩২ ট্রাক গরু ঢাকায় এনেছেন।
রাজধানীর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাব মাঠের হাটে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকেরা পশুর জন্য ঘেরা তৈরি করছেন। কোথাও ট্রাক থেকে গরু নামানো হচ্ছে, আবার কোথাও গরমে স্বস্তি দিতে গরুর গায়ে পানি ঢালা হচ্ছে। তবে হাটের জায়গা নিয়ে কিছু বিক্রেতার মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী থেকে আসা ব্যাপারী আবদুর রাজ্জাক জানান, হাটের সামনের দিকে জায়গা পাওয়ার আশায় তিনি আগেই চলে এসেছেন। এখন ক্রেতারা মূলত দাম জানতেই বেশি আসছেন, মূল কেনাবেচা ঈদের দুই-তিন দিন আগে শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন।
এবার রাজধানীতে গাবতলীর স্থায়ী হাটসহ মোট ২৪টি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১২টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ১১টি অস্থায়ী হাট থাকবে। সারা দেশে হাটের সংখ্যা হবে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি পশু কোরবানি হয়েছিল। এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, যেখানে সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। সে হিসেবে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা।
তবে অধিদপ্তরের এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই বলে দাবি করছেন খামারিরা। তারা বলছেন, ব্যাংকঋণ সংকট, পশুখাদ্যের চড়া দাম, গরু চুরি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবে গত দেড় বছরে দেশে এক হাজারের বেশি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। শুধুমাত্র চট্টগ্রামেই বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক খামার। এই বাস্তবতায় বাজারে পশুর সরবরাহ শেষ পর্যন্ত কেমন থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।