প্রভাত অর্থনীতি: ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংককে অভিনন্দন জানিয়েছে ‘গ্রাহক ফোরাম’। একই সঙ্গে এস. আলমের দখলের পূর্বে যাদের মাধ্যমে ব্যাংকটির বোর্ড পরিচালিত হয়েছিল, তাদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে নতুন পরিচালনা পর্ষদে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত না করে অবিলম্বে সৎ, দক্ষ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক লুটেরাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ার চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক নুরনবী মানিক।
নুরনবী মানিক বলেন, গ্রাহকদের দাবি ছিল এস আলমের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের পদত্যাগ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল এবং ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনরায় এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে, যা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরাপদ নয়। তিনি বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে গ্রাহকেরা ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং বিভিন্ন বক্তব্য ও সিদ্ধান্তের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন করে এবং পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণের নামে বের করে নেয়। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো: ১. অনতিবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা। ২. জোরপূর্বক নেওয়া শেয়ার প্রকৃত মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া। ৩. ব্যাংক লুটেরাদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। ৪. ইসলামী ব্যাংকগুলোকে ঘিরে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। ৫. বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা। ৬. লুটেরাদের পুনর্বাসনের সুযোগ বন্ধ করা। ৭. জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দেওয়া ‘অসত্য বক্তব্য’ প্রত্যাহার করা।
নুরনবী মানিক বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। এটি কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিশ্বাস ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি আরও জানান, এসব দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মঙ্গলবার (১৬ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হবে। দাবি পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে গ্রাহকেরা বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
উল্লেখ্য, রবিবার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের নিয়োগ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। এর আগে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এরপর থেকে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়া চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট অসন্তোষ ও আস্থাহীনতার কারণে গ্রাহকদের ব্যাপক টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের সংকটেও পড়েছে ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।