প্রভাত রিপোর্ট: সদ্য শেষ হয়েছে বোরো মৌসুমের ধান কাটা। গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে নতুন ধান বাজারে আসতে শুরু করলে চালের দাম কিছুটা কমেছিল। তবে সেই স্বস্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম আবার বেড়েছে। অন্যদিকে, ডিম ও মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম কমেছে। সবজি, পেঁয়াজ ও আলুর দামও আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। শনিবার (২০ জুন) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে চিকন চালের দাম ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে। মাসখানেক আগে যে চিকন চালের দাম সর্বনিম্ন ৭০ টাকায় নেমেছিল, তা এখন বেড়ে ৭২ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ কেজিতে বেড়েছে ২ টাকা।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, ভালো মানের চিকন চালের দাম কিছুদিন আগে ৩ থেকে ৫ টাকা কমে ৮০ থেকে ৮২ টাকায় নেমেছিল। বর্তমানে সেই চাল ৮৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে মাঝারি ও মোটা চালের বাজারে। টিসিবির হিসাবে, মাঝারি মানের চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে মাঝারি মানের চাল, যা আগে ৫২ টাকায় নেমেছিল, এখন ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক মাস আগে ৪৮ টাকায় নেমে যাওয়া মোটা চালের দাম কেজিতে ৪ টাকা বেড়ে এখন ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ইসলামপুর বাদামতলীর মেসার্স ইসলাম রাইস এজেন্সির আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গত বছর বোরো মৌসুমের পর বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করে বাজার থেকে ধান কিনেছিল। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ঈদের আগের তুলনায় মিনিকেট চালের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখন মিল মালিকেরা ধানের সরবরাহ কম ও দাম বেশি হওয়ার কথা বলছেন। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে।’
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের হাজী ইসমাইল রাইস এজেন্সির মইন উদ্দিন বলেন, ‘মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, নাজিরশাইল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং আটাশ জাতের চালের দাম ১০০ টাকা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পোলাও চালের দাম, যা বস্তাপ্রতি প্রায় ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের সবজির সরবরাহ ভালো। অধিকাংশ সবজিই ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের লেবু প্রতি হালি ২০ টাকা এবং ছোট লেবু ১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। গোল ও লম্বা বেগুন উভয়ই ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ৮০ টাকা কেজি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীতের পর চাষ হওয়া পটল, কাঁকরোল, বরবটি, লতি ও ধুন্দুলের সরবরাহ বাজারে পর্যাপ্ত রয়েছে। এসব সবজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে করলা ৭০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, মুলা ৫০ টাকা, লতি ৬০ টাকা ও ধুন্দুল ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, গাজর ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কচুরমুখী ৫০ টাকা, পটল ৬০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং বরবটি ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউ প্রতি পিস ৫০ থেকে ৬০ টাকা, আলু ২৫ টাকা কেজি এবং ধনেপাতা ১০ টাকা আঁটি বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্রয়লার মুরগি, সোনালি মুরগি, ডিম ও মাছের ওপর সরাসরি কোনো নতুন কর বা শুল্ক আরোপ করা হয়নি। ফলে ঈদের আগের তুলনায় এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। অন্যান্য বছর বাজেট ঘোষণার পর দাম বাড়লেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি এবং ডিম ডজনপ্রতি ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে বাজেট ঘোষণার পর উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বাজারভেদে দামে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও অধিকাংশ মাছ আগের দামের কাছাকাছিই বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে পাঙাশ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৩০ টাকা, রুই ২৬০ থেকে ৩৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, দেশি টেংরা ৬০০ টাকা, বেলে ৩৫০ টাকা, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ টাকা, কই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা, শোল ৭০০ টাকা এবং টাকি ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তবে চিংড়ির দাম তুলনামূলক বেশি। আকার ও জাতভেদে এর দাম ৫৫০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি।
নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘ঈদের পর মাছের বাজার কিছুটা কমেছে। তবে অধিকাংশ মাছের দাম আগের মতোই রয়েছে। সাধারণত মাছের বাজারে ২০ থেকে ৩০ টাকা ওঠানামা করে। বাজেটের প্রভাব এখানে পড়েনি।’ অন্যদিকে, ঈদুল আজহার পর গরুর মাংসের দাম বাড়েনি। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চালের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। আটা ও ময়দার দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে দুই কেজির আটার প্যাকেট ১২০ টাকা এবং ময়দা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া চিনির দাম ৫ টাকা বেড়ে ১১০ টাকা, দেশি মসুর ডাল ২০ টাকা বেড়ে ১৭০ টাকা, ছোলা ১০ টাকা বেড়ে ৯৫ টাকা, খেসারি ও বুটের ডাল ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা, দেশি মুগডাল ১০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকা এবং মোটা মুগডাল ২০ টাকা বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসলার বাজারেও দাম বেড়েছে। গুঁড়া হলুদ ও মরিচের দাম ১০০ টাকা বেড়ে যথাক্রমে ৩৫০ ও ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।