প্রভাত বিনোদন: সাম্প্রতিক সময়ে অল্প বাজেটে নির্মিত অনেক হরর সিনেমাই দুনিয়াজুড়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। গত বছরের আলোচিত অস্ট্রেলিয়ান সিনেমা ‘ব্রিক হার ব্যাক’-এর ব্যাকের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। চলতি বছর সেই সাফল্যের গল্প লিখছে ‘অবসেশন’। বিশাল বাজেট, তারকাখচিত অভিনয়শিল্পী, কোটি কোটি ডলারের বিপণন—হলিউডে সাফল্যের জন্য এগুলোকে প্রায় অপরিহার্য মনে করা হয়। কিন্তু মাত্র ২৬ বছর বয়সী এক ইউটিউবার সেই ধারণা উল্টে দিয়েছেন। গত কয়েক বছরে অনেক ইউটিউবার হরর সিনেমা বানিয়ে চমকে দিয়েছেন। ‘অবসেশন’–এর নির্মাতা ক্যারি বার্কারও তেমনই। কয়েক বছর আগেও যিনি ইউটিউবে স্কেচ কমেডি ভিডিও বানাতেন, সেই তরুণ এখন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত নির্মাতাদের একজন। তাঁর নির্মিত অতিপ্রাকৃত হরর চলচ্চিত্র ‘অবসেশন’ মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারের বাজেটে তৈরি হয়ে বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ১০৮ মিলিয়নের বেশি! অর্থাৎ বাজেটের ১০০ গুণের বেশি। সিনেমা ব্যবসার ভাষায় এটিকে শুধু সাফল্য বললে কম বলা হবে। এটি একধরনের বিস্ময়।
আজকের দিনে ইউটিউব অনেকের কাছে বিনোদনের মাধ্যম। কারও কাছে পেশা। কিন্তু বার্কারের কাছে এটি ছিল চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ের বিকল্প। বন্ধু কুপার টমলিনসনের সঙ্গে তিনি চালু করেছিলেন ‘দ্যাটস আ ব্যাড আইডিয়া’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেল। সেখানে তারা কমেডি স্কেচ, ছোটগল্প ও পরীক্ষামূলক ভিডিও বানাতেন। ক্যামেরার সামনে হাস্যরসের ভিডিও বানানোর আড়ালে বার্কার শিখছিলেন গল্প বলা, সম্পাদনা, ক্যামেরা পরিচালনা এবং দর্শকের মনস্তত্ত্ব। পরবর্তী সময়ে তিনি বলেছিলেন, ইউটিউবই ছিল তাঁর ‘ফিল্ম স্কুলের বাইরের ফিল্ম স্কুল’।
শৈশব থেকেই বার্কার হরর সিনেমার ভক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ‘দ্য টেক্সাস চেইন শ ম্যাচাকার’ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ভয়, অস্বস্তি এবং বাস্তবতার মিশেলে দর্শকের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সেই আগ্রহই একসময় তাঁকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়ে আসে।
বার্কারের প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ২০২৪ সালের চলচ্চিত্র ‘মিল্ক অ্যান্ড সেরিয়াল’ শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ছবিটির বাজেট ছিল মাত্র ৮০০ ডলার। অনেক নির্মাতার কাছে যেখানে একটি পেশাদার ক্যামেরা ভাড়া করতেই এর চেয়ে বেশি অর্থ লাগে, সেখানে বার্কার বন্ধুদের নিয়ে একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলেন। ছবিটি মুক্তির জন্য তিনি বেছে নেননি কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা চলচ্চিত্র উৎসব; বরং সরাসরি ইউটিউবে প্রকাশ করেন। ফলাফল ছিল অভাবনীয়। সিনেমাটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। দর্শকেরা বুঝতে পারেন, এই তরুণ নির্মাতার মধ্যে আলাদা কিছু আছে। সীমিত সম্পদ নিয়েও তিনি ভয় ও উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। এই ছবিই ভবিষ্যতে বড় সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
২০২৫ সালে বার্কার নির্মাণ করেন তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অবসেশন’। স্বল্প বাজেটের এই হরর চলচ্চিত্র প্রথম প্রদর্শিত হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। মিডনাইট ম্যাডনেস বিভাগে প্রদর্শিত হওয়ার পর থেকেই ছবিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। চলচ্চিত্রটি দর্শক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছবিটির স্বত্ব কিনে নেয় ফোকাস ফিচারস। হলিউডে অনেক সময় বড় স্টুডিওর নজরে আসতে নির্মাতাদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু বার্কারের ক্ষেত্রে সেই অপেক্ষা ছিল না। উৎসবে সাড়া পাওয়ার পরপরই তিনি মূলধারার চলচ্চিত্রশিল্পের অংশ হয়ে ওঠেন।
মে মাসে মুক্তি পাওয়ার আগে বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ছবিটি প্রথম সপ্তাহান্তে ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটল, তা কেউ কল্পনাও করেনি। মুক্তির প্রথম দিনেই ছবিটি আয় করে প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার। প্রথম সপ্তাহ শেষে আয় দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। এরপর শুরু হয় মুখে মুখে প্রচারণার জাদু। দর্শকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটির প্রশংসা করতে থাকেন। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ দর্শকদের মধ্যে ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ফলে দ্বিতীয় সপ্তাহে আয় কমার পরিবর্তে উল্টো বৃদ্ধি পায়। উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে ছবিটির আয় ৩৯ শতাংশ বেড়ে যায়—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা। ক্রমে ছবিটি ১০৮ মিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে।
হরর সিনেমার ইতিহাস বলে, ভয় দেখানোর জন্য বড় বাজেটের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শক্তিশালী ধারণা ও সঠিক বাস্তবায়ন। ‘অবসেশন’-এর ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছে। ছবিতে বড় তারকা নেই। নেই বিপুল ভিএফএক্স। কিন্তু আছে পরিবেশ, রহস্য এবং দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি তৈরি করার ক্ষমতা। হলিউডে বর্তমানে অনেক দর্শকই ফর্মুলা-নির্ভর ব্লকবাস্টারে ক্লান্ত। তাঁরা নতুন কণ্ঠস্বর খুঁজছেন। বার্কার সেই নতুন কণ্ঠস্বরগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছেন।
বক্স অফিস বিশ্লেষক পল পল ডারগারাবেডিয়ান তিন দশকের বেশি সময় ধরে হলিউডের বক্স অফিস পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর ভাষায়, এমন ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় সপ্তাহে কোনো ছবির আয় এভাবে বেড়ে যাওয়া আমি মনে করতে পারছি না। এটা প্রমাণ করে, দর্শক ছবিটিকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন।’ এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে শক্তিশালী ‘ওয়ার্ড অব মাউথ’ বা দর্শকদের ইতিবাচক প্রচারণাকে। হরর ছবির ক্ষেত্রে সাধারণত দর্শকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র থাকে। কিন্তু ‘অবসেশন’ সেই ধারণাও পাল্টে দিয়েছে। ছবিটি দর্শকদের ভোটে সিনেমা স্কোরে ‘এ-’ গ্রেড পেয়েছে, যা হরর সিনেমার জন্য বিরল অর্জন। একই সঙ্গে সমালোচকদের মূল্যায়নভিত্তিক রটেন টমাটোজে ছবিটির স্কোর ৯৪ শতাংশ।
হরর সিনেমার জগতে জেসন ব্লাম একটি কিংবদন্তি নাম। ‘গেট আউট’, ‘ইনসিডিয়াস’, ‘প্যারানরমাল অ্যাকটিভিটি’সহ অনেক সফল হরর চলচ্চিত্রের পেছনে রয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান ব্লামহাউস। ‘অবসেশন’-এর সাফল্যের পর ব্লাম নিজেই বার্কারের পাশে দাঁড়ান। শুধু তা–ই নয়, তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্র নির্মাণেও সহযোগিতা করছেন। এরই মধ্যে ঘোষণা এসেছে, বার্কার নির্মাণ করবেন ‘অ্যানিথিং বাট গোস্টস’ নামের নতুন হরর চলচ্চিত্র। পাশাপাশি তিনি কাজ করছেন ‘দ্য টেক্সস চেইন শ ম্যাচাকার’-এর নতুন সংস্করণ। যে চলচ্চিত্র একসময় তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল, আজ সেই ফ্র্যাঞ্চাইজির দায়িত্বই তাঁর হাতে।
ছবিটির দর্শকদের ৭৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এই তরুণ প্রজন্মই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হরর সিনেমার পুনর্জাগরণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। জেসন ব্লাম মনে করেন, নতুন প্রজন্মের দর্শকের রুচি আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। তাঁর মতে, ‘একটি নতুন প্রজন্মের দর্শক এমন ধরনের হরর সিনেমা খুঁজছে, যা প্রচলিত ধারার বাইরে। এই ক্ষেত্র এখন প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসার জন্য নতুন সম্ভাবনার জায়গা।’
ছবিটির পরিবেশক ফোকাস ফিচারস শুরু থেকেই ভিন্নধর্মী প্রচারণার পথে হাঁটে। সাধারণত স্বাধীন চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে সীমিত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। কিন্তু ‘অবসেশন’ সরাসরি ২ হাজারের বেশি হলে মুক্তি দেওয়া হয়। ছবির গল্পে ব্যবহৃত ‘ওয়ান উইশ উইলোস’ নামের কাল্পনিক জাদুকরি বস্তু বাস্তবে বাজারে বিক্রির জন্য আনা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। এরপর লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্কে রহস্যময় বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়, যেখানে নিকি চরিত্রের অস্বাভাবিক বার্তা ও ভয়েস নোটের অংশ দেখানো হয়। এসব প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণত সিনেমা হলে দর্শক কম থাকে। কিন্তু ‘অবসেশন’ সোম থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিনই উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ১ নম্বরে ছিল। এমনকি ‘মাইকেল’ বা ‘দ্য ডেভিল ওয়ারস প্রাডা ২’-এর মতো বড় আলোচিত ছবিকেও পেছনে ফেলেছিল এটি।
‘অবসেশন’-এর সাফল্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতাকে সামনে এনেছে—ইউটিউব নির্মাতাদের উত্থান। চলতি বছরের শুরুতে ইউটিউবার মারকিপিলার পরিচালিত ‘আয়রন লাং’ মাত্র ৩০ লাখ ডলার বাজেটে তৈরি হয়ে ৫ কোটি ডলার আয় করে। চলতি সপ্তাহে আরেক ইউটিবার কেন পারসনের ‘ব্যাকরুমস’ও বক্স অফিসে বিস্ফোরক সূচনা করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসময় যে ইউটিউবকে সিনেমা হলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই নতুন দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে নিয়ে আসছে। ভ্যারাইটি, দ্য হলিউড রিপোর্টার ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে