প্রভাত রিপোর্ট: ঈদুল আজহার ঠিক আগের দিন ২৭ মে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পর সেখানকার অব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। পরে এ বিষয়ে তদন্ত শেষে সরকার গত ১১ জুন হাসপাতালটির নিবন্ধন বাতিল করে। এখন হাসপাতালটি প্রায় বন্ধের পথে। যদিও তারা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করবে বলে জানিয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের প্রধান ফটকে নিবন্ধন বাতিলের নোটিশ টাঙানো রয়েছে। বন্ধ হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও নতুন রোগী ভর্তি কার্যক্রমও। বহির্বিভাগে রোগী দেখা বন্ধ থাকলেও চিকিৎসাধীন রোগীদের সেবা কার্যক্রম সীমিত আকারে চলছে।
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তে হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষাকার্যক্রমও প্রভাবিত হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজটিতে ২০৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ও ৬৪৬ জন দেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছেন। এছাড়া ৩২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ করছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের এনআইসিইউতে ১৭ নবজাতক চিকিৎসাধীন। চিকিৎসা শেষ হলে তাদের ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে, তবে নতুন কোনো রোগী ভর্তি নেয়া হচ্ছে না।
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। পবিত্র ঈদুল আজহার আগেও এই প্রাঙ্গণ ঠাসা থাকতো জনসমাগমে।
হাসপাতাল ও এর আশপাশ প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মব্যস্ত থাকতো। শত শত রোগী আর তাদের স্বজনদের ভিড়ে হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সদের দম ফেলারও সুযোগ ছিল না। সেই ব্যস্ততার বদলে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এখন নেমেছে নীরবতা।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইকবাল হুসাইন রুদ্র গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালের নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল হওয়ার আগে আমাদের ১০১ শয্যার এনআইসিইউ ইউনিটের সবগুলোতেই রোগী ভর্তি থাকত। লাইসেন্স বাতিলের সময় এনআইসিইউতে ৬০ জন ছিল, যা বর্তমানে কমে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বহির্বিভাগ সম্পূর্ণ বন্ধ, সাধারণ ওয়ার্ডে কোনো রোগী নেই এবং নতুন করে কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না।
লাইসেন্স বাতিলের পর কর্তৃপক্ষ রোগীদের অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা বললেও তারা কোথাও উপযোগী শয্যা না পেয়ে এখনো আদ্-দ্বীন হাসপাতালে রয়ে গেছে বলে জানান ইকবাল হুসাইন। তিনি বলেন, তারা অনেক হাসপাতালে ঘুরেও কোনো এনআইসিইউ শয্যা খালি পায়নি। বাধ্য হয়েই তারা আমাদের এখানে থেকে যায়। ওই মুহূর্তে রোগীদের জোর করে বের করে দিলে এবং তারা অন্য কোথাও ভর্তি হতে না পারলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা মৃত্যু হতে পারতো। সম্পূর্ণ মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এই জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, চিকিৎসার সময়সীমা একেকজনের জন্য একেক রকম (কারও একদিন, কারও এক মাস) হওয়ায় রোগীরা সুস্থ হওয়া মাত্রই তাদের রিলিজ বা ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল।
ইকবাল হুসাইন রুদ্র বলেন, যেসব গাইনি রোগী আগে থেকেই আমাদের এখানে ফলোআপে ছিলেন, তাদের নিয়মিত চেকআপের প্রয়োজন হয়। তারা যখন আমাদের মগবাজার ব্রাঞ্চে আসেন, তখন আমরা নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে তাদের পোস্তখোলা ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিই। চিকিৎসা শেষে আবার মগবাজারে ফিরিয়ে আনা হয়। এই যাতায়াতের জন্য রোগীদের কোনো ভাড়া দিতে হয় না।
বাড্ডা থেকে শিশু রোগী নিয়ে হাসপাতালটিতে আসা মো. সালাউদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালেই সিজারের মাধ্যমে আমার বাবুর জন্ম হয়েছিল। তারপর থেকে তার সব ধরনের চিকিৎসাসেবা আমরা এই হাসপাতাল থেকেই নিয়ে আসছি। হঠাৎ কয়েকদিন আগে বাবুর প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। এখন জ্বরের তীব্রতা কমলেও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। আগের চেয়ে অনেকটা ভালো হলেও মূলত ডাক্তার দেখিয়ে একটু ‘চেকব্যাক’ বা পুনরায় পরীক্ষা করানোর জন্যই আজ এখানে আসা। ঢাকার আদালতের আইনজীবী দুলালের স্ত্রীর ডেলিভারির (প্রসব) তারিখ নির্ধারিত রয়েছে আগামী ১৮-১৯ জুলাই। তার বাসা কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এবং তাদের পরিবারের সবাই সাধারণত এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমার প্রথম সন্তানের জন্ম এই হাসপাতালেই হয়েছিল। দ্বিতীয় সন্তানও যেন এখানে ভূমিষ্ঠ হতে পারে, তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু এর মাঝেই হাসপাতালটি নিয়ে এই ঝামেলা তৈরি হলো। এখন কী করব, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। দুলাল বলেন, অন্য হাসপাতালের খবর আমি জানি না। তবে আমাদের প্রথম সন্তান এখানেই সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে (নরমাল ডেলিভারি) হয়েছিল। আমি সিজার করাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এখানকার চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব; এবং সেটাই হয়েছিল।
ইকবাল হুসাইন রুদ্র বলেন, “বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নীতিমালা অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন, তাকে সেখান থেকেই ইন্টার্নশিপ শেষ করে বের হতে হবে। বর্তমানে ২০৯ জন বিদেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছেন। ৩২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপ করছেন। মোট ৬৪৬ জন দেশি ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত আছেন। মেডিকেল কলেজের ক্লাসগুলো যথারীতি চললেও, হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল (ব্যবহারিক) ক্লাস সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।”
অবশ্য ব্যবহারিক ক্লাস বন্ধের এই জটিলতা নিরসনের জন্য গত ২২ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে যান ৩২ বিদেশি শিক্ষার্থী। সেখানে অধিদপ্তর দুটির মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ পাননি তারা। এরপর ২৩ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করতে যান তারা। কিন্তু সে সময় স্বাস্থ্য সচিব দপ্তরে না থাকায় খালি হাতে ফিরতে হয় তাদের। যদিও সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আশাবাদী বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা বিএমডিসির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এর আগে ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”
মহাপরিচালক আরও জানান, রোগীদের চিকিৎসাসেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভর্তি রোগীদের নিরাপদে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে। তদন্তে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।