প্রভাত অর্থনীতি: গ্যাসসংযোগের অভাব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে হাই-টেক পার্কটি। উদ্বোধনের পাঁচ বছর পর এসে পার্কটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৩৫০ জন মানুষের। আর বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকার মতো।অন্যদিকে জায়গা বরাদ্দ পাওয়া ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ও আপস্কিল বাংলাদেশ নামে দুইটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালু করে। এরমধ্যে ‘আপস্কিল বাংলাদেশ’ তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে পার্কটিতে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে র্যাংগস তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও নানা সংকটের কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারছে না। যার ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত পার্কটির সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেট হাই-টেক পার্ক ঘিরে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ছিল। আর বিনিয়োগের প্রত্যাশা ছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় পাঁচ বছর পরও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কোনোটিরই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
সিলেট নগরী থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত এই পার্কটি নির্মাণে ২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন দেওয়া হয়। ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পার্কটি ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক’ নামে উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নাম পরিবর্তন করে ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’ রাখা হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে সিলেটের অর্থনীতিকে শিল্পায়িত করা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর আশা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (বিএইচটিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হাই-টেক পার্কের প্রায় ৪৪ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ৭৬ একরের বেশি জমি এখনো খালি রয়েছে। প্রশাসনিক ভবনে বরাদ্দযোগ্য ২১,৫৭৬ বর্গফুট স্পেসের মধ্যে ১৯,০৬২ বর্গফুট বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে স্পেস পাওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। জমি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেবলমাত্র র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড তাদের ৩২ একর প্লটে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০২৫ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। জমি বরাদ্দ নেয়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত তাদের অবকাঠামো নির্মাণ করছে, তিনটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করার পর নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছে এবং বাকি প্রতিষ্ঠান এখনো নির্মাণকাজই শুরু করেনি।
র্যাংগসের দেয়া তথ্যমতে, তারা ২০২২ সালে শিল্পভিত্তিক গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে বিএইচটিপিএ ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাদের পক্ষ থেকে পুনরায় আবেদন করলে সেটিও নাকচ করা হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ আবারো আবেদন করেছে এবং সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
হাই-টেক পার্ক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পরিচালিত একটি ৩৩/১১ কেভি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সিলেটে ভারী বর্ষণের কারণে প্রায়শই দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং ঘটে। এসময় বিকল্প কোনো সংযোগ না থাকায় সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
র্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তাদের নিজেদের জমিতে কারখানা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় তারা এই পার্কে এসে বিনিয়োগ করেছেন। তবে সরকারি কাগজপত্রের সুবিধার জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুরু থেকেই পূরণ করা হয়নি।তিনি বলেন, ‘আমাদের অন্যান্য প্রকল্পের মতো ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়েছে।’রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি ছিল তিন বছরের নির্মাণকালে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না এবং ‘ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে’ (লাভ-ক্ষতির সমতা) না পৌঁছানো পর্যন্ত ভাড়া যৌক্তিক রাখা হবে। অথচ প্রথম দিন থেকেই আমাদের ভাড়া দিতে হচ্ছে। তাছাড়া কোনো ব্যাকআপ বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আর রক্ষণাবেক্ষণের কাজের সময় আমাদের দিনের পর দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়।’তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো গ্যাস সংযোগ, যা আমরা নির্মাণকাজ শুরু করার পর থেকেই মন্ত্রণালয় বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে। আমাদের টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার এবং অন্যান্য উৎপাদন লাইন চালু করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আমরা এখন মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছি। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে বাড়তি উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আমাদের বছরে ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।’সিলেট হাই-টেক পার্কের উপ-পরিচালক মো. মাহফুজুল কবির বলেন, বর্তমানে হাই-টেক পার্কে পুরোপুরি চালু বা অপারেশনাল একমাত্র প্রতিষ্ঠান হলো র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। র্যাংগস তাদের কারখানাটি আরও সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়াও এডিএন টেকনোলজিস্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ পরিচালনা করছে।
‘আপ স্কিল বাংলাদেশ’ নামের প্রতিষ্ঠানটি জায়গা বরাদ্দ নিলেও তা ছেড়ে দিচ্ছে।তিনি বলেন, পার্কে মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। যারা এখনো কাজ শুরু করেনি তাদের তাগিদপত্র পাঠানো হচ্ছে এবং যারা প্রকৃতপক্ষে কাজ করবে না তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। তিনি আরও বলেন, পার্কটি শহর থেকে দূরে হওয়ায় এবং গ্যাস সুবিধা না থাকায় এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও স্থানটি প্রান্তিক এলাকায় হওয়ায় ঢাকা বা কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত কারখানার তুলনায় পণ্য সরবরাহ ও পরিবহনে খরচ অনেক বেশি হচ্ছে।
মাহফুজুল কবির বলেন, গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী নীতি-নির্ধারণী সভায় এটি সমাধানের উদ্দেশ্যে আলোচনা করা হবে। পার্কটির নীতিগত ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো নিরসন করা গেলে এখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।