• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ন
Headline
সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই আসছে নতুন বাজেট: অর্থমন্ত্রী লক্ষ্মীপুরে বশিকপুর ইউনিয়নকে অন্য উপজেলা স্থানান্তর না করার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ কালিয়াকৈরে ছিনতাই হওয়া প্রাইভেটকার উদ্ধার, সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার বেনাপোলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়িতে হামলার অভিযোগ অরক্ষিত বিদ্যুতের খুঁটিতে সংস্পর্শে গিয়ে ৫ গরুর মৃত্যু সীমান্তে দুই বাংলাদেশিকে বিএসএফের গুলি সড়কবাতি সম্পর্কে জ্ঞান নিতে ফ্রান্সে যেতে চান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক খাবার মুখে দেয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেয়া লোকটি কে চার দিনে ফটিকছড়িতে ৮ প্রাণহানি,উদ্বেগে সাধারণ মানুষ বেনাপোল সীমান্ত থেকে সেই ১০ জনকে সরিয়ে নিলো বিএসএফ

পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে বিতর্কিত মালিকদের ফেরার সুযোগ বাতিল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত

Reporter Name / ৬ Time View
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ইসলামি ব্যাংকে বিতর্কিত মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখবে না সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের যে ধারায় এই সুযোগ রাখা হয়েছিল, সেটা বাতিল করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে। আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮ (ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা এর শেয়ার ধারক ছিলেন, তাঁরা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এ সুযোগ দিতে পারবে। অবশ্য এর জন্য আবেদনকারীকে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব অর্থ ফেরত দেওয়াসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করতে হবে।
১৮ (ক) ধারা বাতিল হলে তা হবে ভালো সংবাদ। তবে দেখতে হবে পুরোপুরি বাতিল হবে, নাকি বদলে আবার নতুন কিছু যুক্ত হবে।
মো. জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়
ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে নতুন ধারাটি যুক্ত করার পর বিতর্ক তৈরি হয়। সংসদে বিরোধী দলগুলো বলতে থাকে, এস আলমসহ বিতর্কিত ব্যবসায়ীদের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অনুযায়ী গত বছরের ২ ডিসেম্বর এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী—এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। এর মধ্যে নাসা গ্রুপের মালিকানাধীন এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটিই ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মো. জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ১৮ (ক) ধারা বাতিল হলে তা হবে ভালো সংবাদ। তবে দেখতে হবে পুরোপুরি বাতিল হবে, নাকি বদলে আবার নতুন কিছু যুক্ত হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারাটি বাতিলের পেছনে কারণ মূলত দুটি। একটি হলো, সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। অন্যটি বিশ্বব্যাংকের আপত্তি।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, ধারাটি বহাল থাকলে বিশ্বব্যাংক থেকে অন্তত ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ কমানোসহ আর্থিক খাত সংস্কার এবং সার ও জ্বালানি তেল আমদানিতে এই অর্থ ব্যয় করতে চায় সরকার।
ঋণসহায়তা দিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিষয়ে কোনো শর্ত দেয়া হয়েছিল কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে লিখিত বিবৃতিতে মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সংলাপ অব্যাহত রয়েছে। একটি শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত মূলধনসমৃদ্ধ ব্যাংক খাত, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, বেসরকারি খাতনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক রেজোল্যুশন-সংক্রান্ত আইনি কাঠামোকে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। দুর্বল ও স্বল্প মূলধনসম্পন্ন ব্যাংকগুলোর সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য এটি অপরিহার্য।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঋণের নামে বিপুল টাকা বের করে নেয়া এবং তা পরিশোধ না করায় দুর্বল হয়ে পড়ে ১০টির মতো ব্যাংক। এর মধ্যে বেশি সমস্যাগ্রস্ত ৫টি ব্যাংককে একীভূত করার জন্য ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৫ সালের ২৫ মে।
এই পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার ইউনিয়ন ব্যাংকে। ফার্স্ট সিকিউরিটির ৯৬, গ্লোবাল ইসলামীর ৯৫, সোশ্যাল ইসলামীর ৬২ ও এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি।
এদিকে বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১০টি অনুমোদন করেছে। কিছু অধ্যাদেশ পাস করার সময় সংশোধনী আনা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ।
বিএনপি সরকার গঠনের দেড় মাস পর অধ্যাদেশটি সংশোধনের জন্য গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সূত্র বলছে, কমিটির সুপারিশে পুরোনো মালিকদের ব্যাংকে ফেরার সুযোগ রাখার প্রস্তাব ছিল না। বাংলাদেশ ব্যাংকও তা জানত না। সংসদে বিল উত্থাপনের আগে শেষ মুহূর্তে ১৮ (ক) ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারার সমালোচনা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো করেনি; অর্থনীতিবিদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও (বিএবি) ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
আইন পাসের পর টিআইবি এক বিবৃতিতে বলেছিল, দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতকে আবারও দুর্নীতি ও লুটপাটের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বিএবি নেতারা গত ১১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে এ ধারা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানান।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কারও কারও ভিন্নমত ছিল। তাঁদের মত হলো, ব্যাংক একীভূত করতে গিয়ে সরকারকে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করতে হবে। তার বদলে ব্যাংকগুলো ‘বিতর্কিতদের’ বাইরে অন্য কারও মালিকানায় দেওয়া হলে সরকারকে বড় ধরনের আর্থিক চাপ নিতে হতো না।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত এখনো নীতিগত পর্যায়ে আছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া শুরু করবে। বাতিলের জন্য প্রয়োজন হবে আইনের সংশোধনী।
আইনটি সংসদে উত্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ দিয়ে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক উদ্ধার করার মতো সক্ষমতা সরকারের নেই। সে কারণেই এ সুযোগ রাখা হয়েছে।
পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে গড়ে তোলা নতুন ব্যাংকের মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাঁদার টাকায় গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ব্যাংকের আমানত বিমা তহবিল থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা শেয়ারে রূপান্তর করা হবে। বাকি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত আছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একীভূত ব্যাংকটিকে উদ্ধার করতে সরকারকে আরও টাকা দিতে হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের বিতর্কিত ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত এখনো নীতিগত পর্যায়ে আছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া শুরু করবে। বাতিলের জন্য প্রয়োজন হবে আইনের সংশোধনী। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সংশোধনীটি উঠবে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে আমি সতর্কতার সঙ্গে সাধুবাদ জানাচ্ছি। সতর্কতার কারণ ব্যাংক খাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিতর্কিত দৃষ্টান্তও দেখা যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, কোনো সংস্থার শর্তে নয়, বিতর্কিত ধারা বাতিল করা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল। কারণ, এই ধারা বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category