• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ অপরাহ্ন

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যবিত্ত

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ার নতুন ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার ওপর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সংসারের হিসাব মেলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা হোসেন আলী বলেন, সব কিছুর দাম বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। সংসারের খরচ সামলাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। মানিকনগরের গৃহিণী রাহেলা বেগম বলেন, আগে বাজারে গিয়ে তালিকা অনুযায়ী কেনাকাটা করা যেতো। এখন প্রতিটি জিনিস কেনার আগে হিসাব করতে হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছে। একই সময়ে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দামও লিটারপ্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু বিলের খরচ বাড়ায় না; এর প্রভাব কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিপণন ও সেবা খাত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই গিয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে সেই চাপ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে এসবের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়ে। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যায়। শুধু সাধারণ ভোক্তাই নয়, উদ্বেগে রয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারাও। তাদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে রফতানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য সুরক্ষা কর্মসূচি এবং জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই চাপ কমানো সম্ভব হবে না। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ সাধারণ মানুষ। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনই উদ্বেগও কম নয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের আগে সরকারকে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ঋণের চাপের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিপণন এবং সেবা খাত— সবখানেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে, সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category