• রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩১ অপরাহ্ন
Headline
তারেক রহমানের নতুন রাজনীতিতে প্রত্যেক মানুষ সুফল পাবে : আমির খসরু কে হচ্ছেন বঙ্গভবনের বাসিন্দা স্ত্রীকে নিয়ে ভাসমান পেয়ারাবাজারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, স্বাদ নিলেন পেয়ারার বিরোধী দল শেখ হাসিনার ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে তুলে ধরবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী বিচারপতি খায়রুল হককে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার দেখানো যাবে না যদি দুই নেতার আলোচনা হয়, তখন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়: দীনেশ ত্রিবেদী তরুণ নারীরা নেতৃত্বের সুযোগ পেলে শক্তিশালী হবে দেশের ভবিষ্যৎ: জুবাইদা রহমান শিশুদের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে উদ্যোগ নেবে সরকার : তথ্য প্রতিমন্ত্রী খলনায়ক ডনকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন

বিল-বন্ডে ভর করে অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফায় প্রবৃদ্ধি

Reporter Name / ৮ Time View
Update : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলত, সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় এবং ফি-কমিশনভিত্তিক আয়ে প্রবৃদ্ধির কারণে মুনাফায় এই সাফল্য এসেছে। তবে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ প্রভিশনের চাপ সামলাতে না পেরে কয়েকটি ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কম, ট্রেজারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় বেশি, আমানত প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল এবং সুশাসন ভালো, তারা এ সময়ে অন্যদের তুলনায় ভালো করেছে। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি, তারা ওই ঋণ থেকে সুদ আয় করতে পারেন। পাশাপাশি ঋণের বিপরীতে উচ্চ হারে প্রভিশন রাখতে হয়েছে, যা সরাসরি তাদের মুনাফা কমিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে খেলাপি ঋণ। তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলো উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পেরেছে। এসব বিনিয়োগে ঝুঁকি কম এবং প্রভিশনও রাখতে হয়নি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীর থাকায় উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে অনেক ব্যাংক অতিরিক্ত আয় করেছে, যা তাদের মুনাফা বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে।
অবশ্য ‘রুলস-রেগুলেশন’ মেনে চললে কোনো ব্যাংকেরই সমস্যা হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, রুলস-রেগুলেশন মেনে চললেই ব্যাংকগুলোর ভালো পারফর্ম করা সম্ভব। যেখানে অনেক ব্যাংক থেকে মানুষ আমানত সরিয়ে নিচ্ছে, সেখানে কয়েকটি ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য হারে আমানত বাড়ছে। কয়েকটি ব্যাংক তো এখন আমানত নিতে চাচ্ছে না। উল্টো ব্যাংকে গিয়ে মানুষ বলছে যে, সুদ লাগবে না, আমানত নিরাপদ হলেই চলবে। যারা নিয়ম-নীতি না মেনে চলেছে, তারাই এখন বিপদে পড়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) পর্যন্ত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৩১টি চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বাকি পাঁচটি ব্যাংক বর্তমানে একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ায় থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে অনিয়মিত। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৭টি ব্যাংকের মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। সাতটির মুনাফা কমেছে, ছয়টির লোকসান বেড়েছে এবং একটি ব্যাংক মুনাফা থেকে লোকসানে চলে গেছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফা অর্জন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৫৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। আলোচিত সময়ে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ২৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা এবং বিনিয়োগ আয় ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকায়।
ব্র্যাক ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাতে শক্তিশালী অবস্থান, সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ থেকে বেশি আয় এবং কম খেলাপি ঋণ তাদের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার কমে ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ২ দশমিক ২৭ শতাংশ।
অবশ্য রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা বিভাগের প্রধান আকরামুল আলম মনে করেন, কম খরচে আমানত সংগ্রহ এবং পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারায় ব্র্যাক ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা অর্জনে সক্ষম হচ্ছে।
প্রথমার্ধে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৮৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক। আগের বছরের তুলনায় তাদের মুনাফা বেড়েছে ১৯ শতাংশ। যদিও আলোচিত ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। তবে বিনিয়োগ আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৯৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি কমিশন, ব্রোকারেজ ও ফি-ভিত্তিক আয় বাড়ায় ব্যাংকটির মুনাফায় এই প্রবৃদ্ধি এসেছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সিটি ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৫২৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় ১৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে।
আলোচিত ছয় মাসে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৩২১ শতাংশ বেড়ে ৪৪২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ২১ শতাংশ কমেছে। তবে বিনিয়োগ আয় ৫২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪২২ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ায় মুনাফায় এই বড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথ সহজ হয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইস্টার্ন ব্যাংকের নিট মুনাফা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৪৩৯ কোটি টাকা হয়েছে। এসময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৫২ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফা ৬ শতাংশ বেড়ে ৪৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আয় ৪৭ শতাংশ বেড়েছে, যা মুনাফার প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।
এছাড়া, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), এনআরবিসি ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক এবং এসবিএসি ব্যাংকও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে।
অন্যদিকে আলোচিত ছয় মাসে ব্যাংক এশিয়া, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ঢাকা ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। আর দীর্ঘ বছর ধরে লোকসানে থাকা আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণের আরও বেড়েছে।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। গত বছরের প্রথমার্ধে ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা মুনাফা করলেও চলতি বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা সমন্বিত লোকসান করেছে। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আমানতের বিপরীতে ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ব্যাংকে প্লেসমেন্ট থেকে আয় উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাওয়া তাদের আর্থিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংকগুলো যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার বেশিরভাগই মূলত জনসাধারণ থেকে সংগৃহীত আমানতের অর্থ সরাসরি সরকারি সিকিউরিটিজে (বিল-বন্ডে) বিনিয়োগ থেকে এসেছে। এটি ব্যাংকগুলোর জন্য নিরাপদ ব্যবসা হলেও ব্যাংকিং লাইসেন্সের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই কোনো মডেলও নয়। তিনি আরও বলেন, অনেকগুলো ব্যাংকের আমানত বাড়ছে ঠিকই, তবে সেই অর্থ তারা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না করে সরকারি খাতে নিচ্ছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতও বাড়ছে না। যদিও ব্যাংকগুলোর সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা অনৈতিক নয়, তবুও এটি সামগ্রিকভাবে দেশের স্বার্থে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসিতেও এক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবুও নিরাপদ বিবেচনায় ব্যাংকগুলো সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগে ঝুঁকছে। এটি তাদের স্বল্পকালীন ভালো মুনাফা এনে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দেবে না।
বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রত্যেকটি ব্যাংককে আগে থেকেই নগদ রিজার্ভ অনুপাত (সিআরআর) ও সংবিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (সিএলআর) ঠিক করে দেয়। ব্যাংকগুলো সেই অনুযায়ী আমানত ও ঋণ বিতরণ করলে ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। অথচ, অনেক ব্যাংকই রিজার্ভের শর্ত না মেনে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করে থাকে। অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) টার্গেট অনুযায়ী একটি ব্যাংক মোট আমানতের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করতে পারে। কিন্তু, অনেকেই ১০০ শতাংশের বেশিও বিতরণ করে বসে রয়েছে। মোটকথা, যদি ব্যাংকগুলো রুলস-রেগুলেশন মেনে চলে তাহলে ঝামেলায় পড়তে হবে না।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category