প্রভাত অর্থনীতি: পাল্টা শুল্কের কোপে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে। সেই সুযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান দখল করে নেয় বাংলাদেশ। মার্চ শেষেও সেই অবস্থান কিছুটা সুসংহত রয়েছে। আর ভিয়েতনাম শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ পাঁচ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে শুধু ভিয়েতনামের রপ্তানিতে পৌনে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চীন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের রপ্তানি কমেছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
অটেক্সার প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৭৭৩ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ কম।
অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি–মার্চ) বাংলাদেশ ২০৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। গত বছর এই বাজারে বাংলাদেশ ৮২০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে।
অন্যদিকে চীনের রপ্তানি প্রায় ৫৩ শতাংশ কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ে দেশটি রপ্তানি করেছিল দ্বিগুণের বেশি অর্থাৎ ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।
এদিকে বাজারটিতে শীর্ষ রপ্তানিকারক ভিয়েতনাম চলতি বছরের জানুয়ারি–মার্চ সময়ে ৩৯৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। বর্তমানে বাজার হিস্যার ২২ শতাংশ ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে। আর বাংলাদেশের কাছে আছে সাড়ে ১১ শতাংশ।
অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১২২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ইন্দোনেশিয়া। গত বছরের একই সময়ে তাদের রপ্তানি ছিল ১২৩ কোটি ডলার। সেই হিসাবে তাদের রপ্তানি কমেছে দশমিক ১৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের রপ্তানি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চে ১১০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ভারত। গত বছরের একই সময়ে তাদের রপ্তানি ছিল ১৫১ কোটি ডলার। তার মানে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটির রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ।
গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটি ৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও পরে তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ৮ জুলাই সেটি কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায় বাংলাদেশ। তাতে পাল্টা শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। গত ৭ আগস্ট পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়।
পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার কমে হয় ১৯ শতাংশ। তবে ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তারপর সব দেশের পণ্যের ওপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। তবে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতের দুটি বেসরকারি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্ক স্থগিত করেছেন।
পাল্টা শুল্কের প্রস্তাবে শুরুতে বেকায়দায় থাকলেও পরে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায় বাংলাদেশ। তার কারণ, বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামের শুল্ক ছিল ২০ শতাংশ। তার বিপরীতে ভারতের পণ্যে মোট শুল্কহার ৫০ শতাংশ। চীনের শুল্ক আরও বেশি। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। তবে পরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। তার কারণ, শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আর ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। এতে করে ক্রয়াদেশ কমে গেছে, এমনটাই জানালেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা।