প্রভাত ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘দারুণ অগ্রগতি’ হওয়ায় কথা বলে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের এ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কীভাবে উদ্যোগটি পরিচালিত হবে, তার রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
হরমুজে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের জাহাজ ও ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে প্রণালিটি পার হতে সহায়তা করতে গত সোমবার সকাল থেকে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের একটি অভিযান শুরু করেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর তেহরান জ্বালানি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বেড়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমরা পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছি, নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে। তবে “প্রজেক্ট ফ্রিডম” স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হবে, যাতে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা ও স্বাক্ষর করা সম্ভব হয় কি না, তা দেখা যায়। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর বুধবার সকাল পর্যন্ত তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে ট্রাম্পের এই পোস্টের কিছুক্ষণ পরই মার্কিন অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ২ দশমিক ৩০ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়। দুই মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। তার পর থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
চুক্তির বিষয়ে কী অগ্রগতি হয়েছে বা এই স্থগিতাদেশ কত সময় ধরে স্থায়ী হবে—এসব নিয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া মেলেনি।
মঙ্গলবার দিনের শুরুতে ট্রাম্পের পোস্টের আগে রুবিও এবং মার্কিন প্রশাসনের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। জলমাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযান মোতায়েনের হুমকি দিয়ে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে অবরোধ আরোপ করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য নিরাপত্তা পাহারায় চলাচলের ব্যবস্থা করেছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী সোমবার জানিয়েছিল, তারা ইরানের বেশ কয়েকটি ছোট নৌযান এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক অভিযানে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে এই আগ্রাসন শুরু করা হয়েছিল।
রুবিও বলেন, ‘অভিযান এপিক ফিউরি শেষ হয়েছে। বাড়তি আর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক, সেটা আমরা চাইছি না।’
ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ যুদ্ধ ইরান থেকে লেবানন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে; বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান গতকাল বলেছেন, এমনকি যদি এই সংঘাত এখনই শেষ হয়, তবু এর প্রভাব মোকাবিলা করতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে।
রুবিও বলেছেন, এই সংঘাতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ জন বেসামরিক নাবিকও রয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোর ক্রুরা ‘অনাহারে’ এবং ‘বিচ্ছিন্ন অবস্থায়’ রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামরিক শক্তি এখন ‘খুবই দুর্বল’ হয়ে এসেছে। প্রকাশ্যে কড়া হুমকি বা যুদ্ধোন্মাদনা দেখালেও বাস্তবে তেহরান শান্তি চায়।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দিয়ে এ যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের পকেটে প্রভাব ফেলছে, যার প্রভাব ভোটের ওপরও পড়তে পারে।
ট্রাম্প বলেছেন, ইরান থেকে আসন্ন হুমকি দূর করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ হামলা চালিয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং হামাস ও হিজবুল্লাহকে তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ইরান তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনকে তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। তেহরান বলেছে, তারা শান্তিপূর্ণ লক্ষ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়নের অধিকার রাখে, যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণও অন্তর্ভুক্ত—কারণ তারা নিউক্লিয়ার নন-প্রোলিফারেশন ট্রিটির (এনপিটি) সদস্য।
পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ এই যুদ্ধ শেষ করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা এখনো কোনো ফলাফল দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে একদফা সরাসরি শান্তি আলোচনা করেছেন, যদিও ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। পরবর্তী বৈঠক আয়োজন প্রচেষ্টাও এখনো সফল হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা এখনো চলছে। আরাগচি বুধবার সকালে বেইজিংয়ে পৌঁছান, যেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে। ট্রাম্পেরও এই মাসে চীন সফরের কথা রয়েছে।