প্রভাত ডেস্ক: তিন মাসের বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালির কাছে আটকে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এমন একটা জায়গায় আটকা পড়ছি, ধরে নিতে পারেন এটা একটা পুকুর। আমাদের বের হওয়ার রাস্তা একটাই, সেটা হরমুজ। জানি না কবে বের হতে পারব।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েছেন ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামসহ আরও ২০ হাজার বিদেশি নাবিক। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ যে কৌশলগত পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, তা এখন পুরোপুরি অচল। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র, আর সাগরের নিচে পাতা হচ্ছে মাইন। এই মরণফাঁদের মাঝেই প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হওয়া ‘বাংলার জয়যাত্রা’ ও এর ৩১ জন ক্রু এখন পারস্য উপসাগরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন।
মিসাইল ও মাইনের সরাসরি হুমকি ছাড়াও, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) হিসাব অনুযায়ী হরমুজের ভুল পাশে আটকে থাকা প্রায় ১,৬০০টি জাহাজের এখন আর বের হওয়ার সুযোগ নেই। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পরেই ইরান এই সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয় এবং তাদের অনুমতি ছাড়া এই পথ দিয়ে কারও যাওয়ার সুযোগ নেই।
ক্যাপ্টেন শফিকুলের মতো হরমুজে আটকে আছেন পাকিস্তানি জাহাজের ক্যাপ্টেন হাসান খানও (ছদ্মনাম)। পাকিস্তানি এই নাবিক বলেন, ‘বাইরের সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরের মানুষগুলো যে কতটা অস্থির, তা সত্যিই অদ্ভুত।’
যুদ্ধক্ষেত্রের এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাগরে আটকে থাকা জাহাজের জন্য এখন খাদ্য ও পানির জোগান দেওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুবাই বা আবুধাবি থেকে সরবরাহকারী বোটের মাধ্যমে খাবার ও পানি পাওয়া গেলেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বহুগুণ।
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে পানির দাম। বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বলেন, ‘আমরা দুই দিন আগে জাহাজের জন্য প্রায় ১৮০ টন পানি কিনেছি। আগে যার দাম ছিল ১,৫০০ থেকে ২,০০০ ডলার, এখন তা কিনতে আমাদের ১১,০০০ ডলার খরচ হয়েছে।’
অন্য একটি জাহাজে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বেনামী নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মনে হচ্ছে কিছু খাদ্য ও পানি সরবরাহকারী এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।’
সামনে গ্রীষ্মকাল আসায় পানির সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মে মাসেই যেখানে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, সেখানে জুনে তা ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ক্যাপ্টেন হাসানের জাহাজে খাবার থাকলেও শাকসবজি ও ডাল ফুরিয়ে এসেছে, এখন শুধু মুরগি ও গরুর মাংস খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে ক্রুদের।
এত সংকটের পরও ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার দ্বিতীয় দিনে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে অবস্থান করছিল, যখন বন্দরটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
কোনোক্রমে রক্ষা পেলেও এরপর থেকে গত তিন মাসে কতবার হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার হিসাব হারিয়ে ফেলেছেন ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম ও তার ক্রুরা।
চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান বলেন, ‘যখন সারা রাত ধরে হামলা চলত, আমাদের কেউ ঘুমাতে পারতাম না। আমরা নিজের চোখে ভয়াবহতা এবং ধ্বংসলীলা দেখেছি।’
তারা আশঙ্কায় রয়েছেন এবং এর পেছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আইএমও-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি যাচাইকৃত হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত অন্তত ১১ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। যুদ্ধবিরতি হলেও নিয়মিত আকাশে ড্রোন, ফাইটার জেট এবং সাগরে যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত ভয়ের সৃষ্টি করছে।
এই মরণফাঁদের মাঝেই পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন হাসানের জাহাজের ক্রুরা সাধারণ কর্মব্যস্ততা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন; যদিও তীরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাসিখুশি আড্ডা এখন রূপ নিয়েছে এক থমথমে নীরবতায়। কেবল ফোনের ভাইব্রেশন বা সামান্যতম শব্দেই কেঁপে উঠছেন তারা, ঘুমের ঘোরেও অতি সামান্য শব্দে ধড়ফড় করে জেগে উঠছেন অনেকে। হাসান খান বলেন, ‘মানসিক চাপ সব সময় আমাদের মাথায় চেপে থাকে। প্রত্যেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ক্লান্ত।’
বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম গত তিন মাসে দুবার বের হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্য একটি জাহাজকে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে শুনে তিনি আরও পাঁচটি জাহাজের সঙ্গে হরমুজের দিকে রওনা হন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরেই তাদের ফিরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৭ এপ্রিল ইরান যখন ঘোষণা দেয় যে যুদ্ধবিরতির আওতায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য পথ সম্পূর্ণ খোলা থাকবে, তখন তিনি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবরোধ প্রত্যাহার না করায় ইরান শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। ততক্ষণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রণালির মাত্র ৩০ নটিক্যাল মাইল দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। রেডিওতে ভেসে আসা হামলার সতর্কবার্তা শুনে আবারও জাহাজ ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে বাধ্য হন তিনি।
আটকে থাকা এই জাহাজটিকে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সমুদ্রের এই যুদ্ধক্ষেত্রে কূটনীতিও এক বড় গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
মেরিটাইম ডাটা ফার্ম কেপলারের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে, যার বেশিরভাগই চীন, ভারত ও পাকিস্তানের। বিশ্লেষকদের দাবি, এই দেশগুলো সরাসরি ইরানের সাথে কূটনীতি এবং জাহাজপ্রতি কয়েক মিলিয়ন ডলার ‘টোল’ পরিশোধের মাধ্যমে পার পাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
কূটনীতিই এখন ‘বাংলার জয়যাত্রা’র একমাত্র আশা। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) জাহাজটিকে মুক্ত করতে কাজ করছে। তবে সেখানেও এক বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, প্রথমে বাংলাদেশও ইরানের দাবি করা টোল দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কোনো দেশ ইরানকে এই অর্থ দিলে সেই দেশের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে ওয়াশিংটন হুমকি দেওয়ার পর সেই পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘আমরা এখন এক উভয়সংকটের মধ্যে রয়েছি।’
সূত্র: বিবিসি, টিবিএস