• শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
Headline
কোরবানির বাজারে এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা ব্যাপারীদের ৩- ৪ বছর মেয়াদে আইএমএফ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার নেয়ার ভাবনা সরকারের জমে উঠেছে ফ্রিজের বাজার, বিক্রিও বেড়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সীমান্তে ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্প চালু করছে ভারত বাহামায় নিজের ছেলের বিয়েতে কেন থাকছেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প অর্ধেকের বেশি অঙ্গরাজ্যের ভোটিং মেশিন নিষিদ্ধে উদ্যোগ ছিল ট্রাম্পের ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন নিয়ে ন্যাটো মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা রুবিওর ভারতে সফর শুরু করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তালেবানের নতুন আইনে আফগানিস্তানে বৈধতা পাচ্ছে বাল্যবিবাহ মেরে ফেলার হুমকি, তবু দমবে না `ককরোচ জনতা পার্টি’

৩- ৪ বছর মেয়াদে আইএমএফ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার নেয়ার ভাবনা সরকারের

Reporter Name / ৯ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের করা ঋণ চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। একইসাথে অর্থের সংকট মোকাবিলায় আইএমএফ থেকে ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদে ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়ার কথাও ভাবছে বর্তমান সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে তথ্য জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল ও আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তাব তোলা হয়। একইসাথে নতুনভাবে ঋণ কর্মসূচি শুরু করার প্রস্তাব করে বাংলাদেশ।
এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বোর্ড সভায় বাংলাদেশের ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সংস্থাটি চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় কিস্তি ছাড় করতে অনীহা প্রকাশ করে নতুন শর্তে নতুন করে ঋণচুক্তি করতে সরকারকে পরামর্শ দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারে অনীহা এবং ভর্তুকি কমানোর কৌশল বের করতে না পারার কারণেই বর্তমান সরকার আইএমএফের চলমান কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, সরকার বর্তমান কর্মসূচিতে আর থাকতে চায় না। একইসঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামো, সময়সীমা ও অর্থের পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আইএমএফও এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে এ বিষয়ে বাংলাদেশ আইএমএফকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকা সফর করবে। তখন ঋণের পরিমাণ, সময়সীমা ও শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
গত ১১ মে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের চলমান ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত রয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘উপযুক্ত’ নয়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচিত সরকার। জনগণের প্রতি ‘দায়বদ্ধতা’ থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না। অনেক জায়গায় আইএমএফের সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য স্যুটেবল না। তিনি বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে বেশিরভাগ উন্নয়ন সহযোগীরা একমত। তারা আমার উন্নয়ন সহযোগী। ওরা যদি আমার সঙ্গে একমত না হয়, আমি তো এগোতে পারব না।’
আইএমএফের শর্তের বিপক্ষে সরকারের অবস্থান জারি রাখার ব্যাখ্যায় আমির খসরু বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত সরকার। আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। তাদের কথামতো আমরা তো সব করতে পারব না।’
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর সাত কিস্তিতে আইএমএফ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি করে। ইতিমধ্যে ওই ঋণের চারটি কিস্তি ছাড় হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ঋণ ছাড় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সর্বশেষ পঞ্চম কিস্তি ছাড় করার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু ওই সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ায় আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচিত সরকার এলেই তারা ঋণ ছাড় করা সিদ্ধান্ত নেবে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের স্প্রিং মিটিং। ওই মিটিংয়ের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া এক বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সংস্কার কার্যক্রমে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে আর কোনো কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে না।
চলতি বছরের জুনের মধ্যে বিদ্যমান কর্মসূচির পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তি মিলিয়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে সংস্কার অগ্রগতিতে অসন্তোষ থাকায় সেই অর্থ ছাড় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
গত ১৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন সফর শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া এই কর্মসূচিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা নির্বাচিত সরকার। জনস্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত আমরা মেনে নেব না।’
সরকার ও আইএমএফের মধ্যে মতবিরোধের প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি হ্রাস, ব্যাংক খাত সংস্কার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার আপাতত এসব কঠোর সংস্কারে যেতে আগ্রহী নয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি সক্রিয় আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ‘সিল অভ অ্যাপ্রুভাল’ হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে আগামী কয়েক বছরে বার্ষিক ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা প্রয়োজন হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফ থেকে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেলে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া সহজ হবে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে এর আকার বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে, বাকি রয়েছে ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার। তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাত সংস্কারে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় আইএমএফ উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন মার্চে ঢাকা সফরে এসে সরকারের কাছে তাদের অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট করেন।
এই ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি কঠোর শর্ত দিয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা। এখনো পর্যন্ত সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি করতে পারেনি।
ব্যাংক খাতের সংস্কার হলেও ব্যাংক রেজল্যুশন আইনে নতুন একটি ধারা যোগ করে বর্তমান সরকার একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আইএমএফ এই ধারাটি বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া আইএমএফের শর্ত ছিল প্রতি বছর জিডিপির অন্তত ০.৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য পূরণে এনবিআর ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশও জারি করা হয়। কিন্তু উদ্যোগটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি এবং নতুন সরকার পরে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দেয়। তবে আইএমএফ চাইছে, আগামী মাসের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত আইন কার্যকর করা হোক।
অর্থ বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক ও রাজস্ব খাত সংস্কারে নতুন সরকারের অবস্থান নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধনের পর তারা একে আর্থিক খাত সংস্কারে পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। শুধু ব্যাংক খাত নয়, রাজস্ব খাত সংস্কার নিয়েও চাপ বাড়ছে। কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, টার্নওভার কর চালু এবং করপোরেট কর পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি চাইছে দাতারা।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি সীমিত করার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দাতাদের মতে, সর্বজনীন ভর্তুকি অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। এর পরিবর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি চালুর সুপারিশ করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category