প্রভাত ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার এবং পারস্য উপসাগরে তেহরানের একটি দ্বীপ দখলের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা উৎসাহ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের কেউ কেউ আমিরাতকে ‘লাভান দ্বীপ’ দখলের পরামর্শ দিয়েছেন। গত এপ্রিলের শুরুতে আমিরাত অত্যন্ত গোপনে সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছিল বলে খবর রয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘যান, ওগুলো দখল করুন! এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে আমিরাতি বাহিনীই সরাসরি মাঠে থাকবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১১ সপ্তাহের এই যুদ্ধে এবং ইরানের ভয়াবহ বোমাবর্ষণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক নাটকীয় ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে হামলা শুরু করে, তখন থেকেই তেহরানের পাল্টা আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে আমিরাত।
দেশটির ওপর ২,৮০০টিরও বেশি মিসাইল ও ড্রোন হামলার ঘটনাকে বিশ্লেষকরা আমিরাতের জন্য ‘১১ সেপ্টেম্বর মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই পরিস্থিতি আমিরাতকে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জোট এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই যুদ্ধের ফলে আমিরাত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক গভীর করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তাদের টানাপোড়েন বাড়ছে। এমনকি মে মাসের শুরুতে আমিরাত সৌদি-নিয়ন্ত্রিত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ‘ওপেক’ থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
আমিরাতের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত বারবারা লিফ ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলেন, ‘পরিস্থিতি যত দীর্ঘ হচ্ছে, তারা বিশ্ব ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান নিয়ে ভাবার তত বেশি সময় পাচ্ছে। তারা এখন সবকিছু খুব স্পষ্টভাবে বন্ধু বা শত্রু—এই দুই ভাগে ভাগ করে দেখছে।’
২০২০ সালে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আমিরাত এই যুদ্ধের সময় তেল আবিবের আরও কাছে এসেছে। জানা গেছে, ইরানি হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েল আমিরাতকে তাদের ‘আয়রন ডোম’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন যে তিনি গত মার্চ মাসে দেশটিতে এক গোপন সফর করেছেন এবং সেখানে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। যদিও আবুধাবি এই সফরের কথা অস্বীকার করেছে।
ইরান ইতিমধ্যে আমিরাতকে এই যুদ্ধের ‘সক্রিয় অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর জবাবে আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করছে এবং যেকোনো হামলা মোকাবিলায় তাদের সার্বভৌম ও সামরিক অধিকার বজায় রাখবে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. বুরকু ওজচেলিক বলেন, এই যুদ্ধ ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-আমিরাত’ একীভূতকরণকে ত্বরান্বিত করেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তেহরানের হামলার ফলে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও জোরালো হবে এবং ইসরায়েলি প্রভাব আরও বাড়বে।তবে এই নতুন মেরুকরণ আমিরাতের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করছে। অন্যান্য আরব দেশগুলো তাদের এই অবস্থানকে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের জন্যও আমিরাতের বিতর্কিত আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের (যেমন সুদানে আরএসএফ-কে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ) সাথে জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও আমিরাত সুদানে বিদ্রোহীদের সমর্থনের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।