• শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:১১ পূর্বাহ্ন
Headline
মায়েদের নিয়ে পিরোজপুরে মাদকবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত ঢাকা থেকে খুনি ভাড়া করে এনে উপজেলা বিএনপি সভাপতিকে হত্যা, নেপথ্যে কারা বন্যার্তদের সহযোগিতায় গাইবেন রুনা লায়লা প্রিয় দলের জয়ের সাথে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে মেলাতে নারাজ তানজিন তিশা শৃঙ্খলাজনিত কারণে মাইলস্টোন থেকে টিসি দেওয়া হয়েছিল সুহিকে রথযাত্রার অনুষ্ঠানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন মির্জা ফখরুল শিশু ইয়ামালের সঙ্গে লাজুক মেসির সেই বিখ্যাত ছবিটি কীভাবে তোলা হয়েছিল শরণখোলায় দম্পতির লাশ উদ্ধার, চিরকুটে লেখা, ‘আমাদেরকে মাফ করে দিও’ বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ চীন হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ,অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা, চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে নারী শ্রমিকরা

Reporter Name / ৯ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন নারী শ্রমিকরা। গত তিন দশকে এই খাত শুধু দেশের রফতানি আয় বাড়ায়নি, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যে খাত লাখো নারীর জীবনে পরিবর্তনের সূচনা করেছিল, সেই খাতেই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সর্বশেষ গবেষণা বলছে, প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পুনর্দক্ষতা কর্মসূচি না থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার চাকরি অটোমেশনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) আয়োজিত ‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে গবেষণাটি প্রকাশ করা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকরা মূলত এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত, যেগুলো একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক এবং সহজে যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব। সেলাই, কাটিং, ফিনিশিং, প্যাকেজিং কিংবা মান নিয়ন্ত্রণের অনেক ধাপ এখন আধুনিক যন্ত্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং কম খরচে করা যাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং দক্ষতা বাড়ানোর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পোশাক কারখানাগুলো ধীরে ধীরে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। এতে প্রথম ধাক্কাটা লাগছে সেইসব পদে, যেখানে নারী শ্রমিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রযুক্তির কারণে শুধু চাকরি কমবে না, বরং কাজের ধরনও বদলে যাবে। ভবিষ্যতের কারখানায় যন্ত্র পরিচালনা, ডিজিটাল উৎপাদন ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর কাজের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত অধিকাংশ নারী শ্রমিকের সেই দক্ষতা নেই। পুনর্দক্ষতা অর্জনের সুযোগও সীমিত। ফলে তারা নতুন কর্মপরিবেশে নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পারলে চাকরি হারানোর ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, ভবিষ্যতের আশঙ্কা ইতোমধ্যে বাস্তবতার রূপ নিতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালেই দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মীদের চাকরি। অর্থাৎ শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য ইতোমধ্যে নারীরাই দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কমানোর চাপ বাড়বে। সেই চাপ মোকাবিলায় অনেক প্রতিষ্ঠান অটোমেশন ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে। এর ফলে শ্রমঘন শিল্পে কর্মসংস্থান আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা দক্ষতার অমিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে ধরনের দক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছেন, শিল্প খাতের চাহিদা তার সঙ্গে মিলছে না।” তিনি জানান, বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) ভর্তির হার ২০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের জন্য এটি মোটেও যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা পুনর্দক্ষতা কর্মসূচি, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং কর্মস্থলভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন না হলে তারা নতুন কর্মপরিবেশে পিছিয়ে পড়বেন।
সিপিডির গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দেশে উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান প্রায় ৮১ লাখেই স্থির রয়েছে। অপরদিকে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ সেবা খাতে কাজ করলেও তাদের বড় অংশ অনিরাপদ ও কম উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন আর আগের মতো নতুন ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতিমালা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শ্রমবাজারকে প্রস্তুত করা না গেলে বৈষম্য আরও বাড়বে।”
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে এআই ও অটোমেশন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও একই সময়ে ৯০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, তেমনি পুরোনো অনেক পেশার অবসানও ঘটাবে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে নতুন দক্ষতা অর্জনের বিকল্প থাকবে না।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এখনই শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সংস্কার, জীবনব্যাপী পুনর্দক্ষতা কর্মসূচি, কর্মসংস্থানভিত্তিক শিল্প প্রণোদনা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ রূপান্তর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে দেশের নীতিনির্ধারকেরা কত দ্রুত শ্রমশক্তিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারেন তার ওপর। অন্যথায় যে নারী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি গড়ে তুলেছেন, প্রযুক্তির নতুন যুগে তারাই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category