প্রভাত রিপোর্ট: দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে একটি গণতান্ত্রিক, উৎপাদনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে সরকারি কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং বাজারভিত্তিক নীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মঙ্গলবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭ : প্রত্যাশা ও বাস্তবায়ন’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। বিশেষ অতিথি ছিলেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী, বিটিএমএর প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিতে জমে থাকা বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে একটি জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রয়োজন। যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমীর খসরু বলেন, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে নারী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সৃজনশীল শিল্পের মতো খাতে সরকারের একক ভূমিকার পরিবর্তে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপও কমবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাজার ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতার অভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং কারসাজির অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিল্পায়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আমীর খসরু আরও বলেন, গণতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অর্থ হলো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বাজারে প্রতিযোগিতা থাকবে, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় থাকবে। এতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে।
দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় জনগণের ধৈর্য ও গঠনমূলক সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নাও হতে পারে। তবে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং সঠিক অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা গেলে দেশের অর্থনীতি আবারও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, আমীর খসরুর বক্তব্যে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, পুঁজিবাজার সংস্কার, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং সুশাসনভিত্তিক প্রবৃদ্ধির যে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, তা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতি ও বাজেট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।