প্রভাত ডেস্ক: ভারতের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণে গ্রেট নিকোবর দ্বীপের অবস্থান। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের বেশি কাছে অবস্থিত। দ্বীপটির আয়তন হংকংয়ের প্রায় সমান। তবে ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতের আর কোনো প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাননি। এমনকি ভারত এখন পর্যন্ত দ্বীপটির পূর্ণাঙ্গ কোনো আদমশুমারিও করেনি। তাই সেখানকার বাসিন্দা কত, তা অনুমাননির্ভর। সর্বশেষ ধারণা অনুযায়ী, সেখানে ১০ হাজারের কম মানুষ বসবাস করেন।
এসব সত্ত্বেও দ্বীপটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম মনোযোগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ভারত মহাসাগরে এই গ্রেট নিকোবরকে একটি প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এ জন্য ১ হাজার ১০০ কোটি (১১ বিলিয়ন) ডলারের একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তারা।
মোদি সরকার দ্বীপটিতে একটি পণ্য খালাসের বন্দর (ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট), একটি বেসামরিক-সামরিক বিমানবন্দর, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের জন্য একটি জনপদ গড়ে তোলার অনুমোদন দিয়েছে। সরকারের দাবি, সামুদ্রিক বাণিজ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে এতে এত বিপুল টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক পরিবেশবাদী সংগঠন ও নয়াদিল্লির বিরোধীদলীয় নেতাদের সমালোচনার মুখে ভারত সরকার সম্প্রতি নিজেদের সুর বদলেছে। এখন তারা সরকারের পরিকল্পনাকে দেশের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রচার করছে।
তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার পর গ্রেট নিকোবর নিয়ে মোদি সরকারের পরিকল্পনা আরও জোরদার হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আশপাশের অঞ্চলে ঘাঁটি তৈরি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হরমুজ সংকট নয়াদিল্লিকে মনে করিয়ে দিয়েছে। গ্রেট নিকোবরের ক্ষেত্রে এই জলপথ হলো মালাক্কা প্রণালি। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেল আনা-নেওয়া করা হয়।
বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার (৯৯৪ মাইল) দূরে অবস্থিত। এটি মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথের খুব কাছে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক ভাইস চিফ শেখর সিনহা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব আছে। কারণ, এটি ঠিক মালাক্কা প্রণালির মুখে অবস্থিত।…এটিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে কেউ আপত্তি তুলতে পারবে না।’
বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার (৯৯৪ মাইল) দূরে অবস্থিত। এটি মালাক্কা প্রণালির পশ্চিম প্রবেশপথের খুব কাছে। দ্বীপটি পূর্ব-পশ্চিম সমুদ্র বাণিজ্যপথের পাশেই অবস্থিত। এই পথ দিয়েই পারস্য উপসাগর, ইউরোপ এবং চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ চলে।
সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপ চ্যানেলে এই প্রণালি সবচেয়ে সরু। সেখানে এর প্রস্থ মাত্র ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার (১ দশমিক ৭ মাইল)। এত সরু হওয়া সত্ত্বেও এটি মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযোগকারী প্রধান জলপথ।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হলেও তা চীনের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চীন তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এবং মোট বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে করে থাকে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গ্রেট নিকোবর দ্বীপটি মালাক্কা প্রণালির ওপর নজরদারির জন্য ভারতের মূল্যবান ‘অতন্দ্র প্রহরী’ হয়ে উঠতে পারে।
সাবেক নৌ কর্মকর্তা সিনহা বলেন, ‘এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা সব জাহাজের ওপর নজর রাখতে এটি [গ্রেট নিকোবর] একটি চমৎকার জায়গা। এটি সমুদ্রসীমায় ভারতের নজরদারির সক্ষমতাকে (ম্যারিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস) অনেক বাড়িয়ে দেবে।’ মোদি সরকার এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্বের কথা ক্রমে স্বীকার করতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হলেও তা চীনের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চীন তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এবং মোট বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে করে থাকে।
গত মে মাসে সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গ্রেট নিকোবর প্রকল্পটি ‘একটি কৌশলগত প্রকল্প, যার লক্ষ্য আন্দামান সাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি শক্তিশালী করা’।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘এই প্রকল্প ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা উপস্থিতি জোরদার করতে, দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে এবং এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে তৈরি করা হয়েছে।’
তবে ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনায় প্রকল্পটিকে শুরুর দিকে এভাবে ভাবা হয়নি। বরং সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো বা হংকংয়ের মতো গভীর সমুদ্রবন্দরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার লক্ষ্যেই তা সামনে আনা হয়েছিল।
অন্যদিকে নয়াদিল্লির এই পরিকল্পনা দ্রুত তীব্র বাধার মুখে পড়েছে। দ্বীপের বাসিন্দারা প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য নিজেদের জমি ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি সরকারের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তাঁরা একাধিক আদালতে মামলাও করেছেন।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপের গভীর অরণ্যে কয়েক শ ‘শম্পেন’ জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন। যাযাবর প্রকৃতির এই জাতি মূলত শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। এ ছাড়া চমৎকার এই বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করেন মাছশিকারি কয়েক হাজার নিকোবরি আদিবাসী। প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার (৪০০ বর্গমাইল) আয়তনের এই দ্বীপে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বহিরাগত ও বসতি স্থাপনকারী মানুষ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে।
সরকারের প্রকল্পটি বর্তমানে ১৬৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার জমির ওপর নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পুরো দ্বীপের প্রায় ১৬ শতাংশ। এই জমির প্রায় অর্ধেক আদিবাসীদের সংরক্ষিত এলাকায় পড়েছে, যেখানে শম্পেনরা বসবাস করে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩৯ জন গণহত্যাবিশেষজ্ঞ ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তাঁরা সতর্ক করে বলেন, এই প্রকল্প ‘শম্পেনদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের’ মতো, যা আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) শামিল।
ভারতের পরিবেশমন্ত্রী ২০২৩ সালে পার্লামেন্টে জানান, এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৬৪ হাজার গাছ কাটা হবে। এই উন্নয়নের ফলে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় নিকোবরি সম্প্রদায়ও বাস্তুচ্যুত হবে। আর আগামী তিন দশকে সেখানে ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে। যদি এমনটা ঘটে, তবে তার অর্থ দাঁড়াবে, দ্বীপটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হবে প্রায় ৪ হাজার শতাংশ।
প্রতিবাদ সত্ত্বেও এই প্রকল্পের আওতায় নিকোবরি সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষদের জমিকে একটি পর্যটন অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারত সরকার দাবি করে আসছে, এসব সমালোচনা ভিত্তিহীন। বরং এই প্রকল্পটি দ্বীপের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি আদর্শ মডেল হবে। তবে পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এই দ্বীপপুঞ্জে বড় আকারের বন উজাড়, উপকূলের পরিবর্তন এবং অবকাঠামো নির্মাণের ফলে গ্রেট নিকোবরের ভঙ্গুর পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া দ্বীপটি ভূমিকম্পের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ‘সিসমিক জোন ৫’-এর মধ্যে পড়েছে। ফলে গ্রেট নিকোবরে যেকোনো বড় নির্মাণ প্রকল্প অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এক মাস আগে এই দ্বীপ পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় আন্দোলনকারী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে দেখা করেন, কথা বলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কংগ্রেসের এই নেতা লেখেন, ‘সরকার এখানে যা করছে তাকে একটি “প্রকল্প” বলছে…অথচ মানুষের ঘরবাড়ি কেড়ে নিয়ে তাঁদেরকেই অবহেলা করা হয়েছে। এটি আসলে উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ।’
রাহুল গান্ধী দাবি করেন, গ্রেট নিকোবর প্রকল্পটি ‘আমাদের জীবনকালের মধ্যে এই দেশের প্রাকৃতিক ও আদিবাসী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি ও গুরুতর অপরাধ।’
রাহুল দ্বীপটিতে তাঁর দাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে করা ইন্দিরা পয়েন্ট লাইটহাউস বা বাতিঘর পরিদর্শন করেন। এটি দ্বীপটি তথা ভারতের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণের প্রান্তর।
২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামি গ্রেট নিকোবরের দক্ষিণ প্রান্তের কিছু অংশকে প্রায় ৪ দশমিক ২৫ মিটার (১৪ ফুট) নিচে দাবিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ইন্দিরা পয়েন্টের চারপাশের উপকূলের কিছু অংশ পানির নিচে চলে গেছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর ট্রাইবাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের গবেষণা উপদেষ্টা বোর্ডের সাবেক সদস্য মনিষ চান্ডি বলেন, ‘এই প্রকল্প প্রচণ্ড ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রকাশ।’
চান্ডি দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই দ্বীপপুঞ্জ ও এখানকার মানুষদের নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য গ্রেট নিকোবরকে একটি বাণিজ্যিক ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলা উল্লেখ করে এ গবেষক আল–জাজিরাকে বলেন, তীব্র প্রতিবাদের মুখে সরকার এখন এই উদ্যোগটিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে। এটি (মোদি সরকারের জাতীয়তাবাদী) রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে বেশ মিলে যায়।
শুরুর দিকে প্রকল্পটির জন্য যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, এখন তা বদলানো হয়েছে। প্রকল্পের যৌক্তিকতা বদলে এখন কৌশলগত লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ২০২০ সালে সরকারের শীর্ষ পরিকল্পনা সংস্থার গ্রেট নিকোবর উন্নয়ন উদ্যোগের মহাপরিকল্পনা নেওয়ার পর থেকে বিশ্বও অনেক বদলে গেছে। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, এই পরিবর্তনের কারণে ভারতকে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ পন্ত বলেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির ধরন ক্রমেই আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার জন্য ভারতের নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে নতুন করে মূল্যায়ন করাটা স্বাভাবিক।’
গ্রেট নিকোবর থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার (৩১০ মাইল) দূরে এই দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী শ্রী বিজয়া পুরমে (যার সাবেক নাম পোর্ট ব্লেয়ার) ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ‘ত্রিমাত্রিক বাহিনী কমান্ড’ (স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ কমান্ড) অবস্থিত।
হর্ষ পন্তের মতে, গ্রেট নিকোবরকে গড়ে তোলা হলে তা ‘এই কমান্ডকে আরও শক্তিশালী ও অপরাজেয় করবে এবং সামগ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কী ঘটছে, তার ওপর নজর রাখতে এই ভৌগোলিক অবস্থানকে ব্যবহার করা যাবে।’
ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণকে কূটনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, তা দেখে ভারতের কৌশলগত চিন্তাবিদদের একটি অংশ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছেন। তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে কোনো সংঘাত হলে নয়াদিল্লি গ্রেট নিকোবরের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে মালাক্কা প্রণালি অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। তবে সাবেক নৌ কর্মকর্তা সিনহা এ ধরনের ধারণাকে এতটা গুরুত্ব দিতে রাজি নন।
সিনহা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি হলো ইরান ও ওমানের। একইভাবে মালাক্কা প্রণালি ইন্দোনেশিয়ার। এই জলপথ ইন্দোনেশিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। আর এই অঞ্চলের জলসীমায় শান্তি বজায় থাকাটা সবার আগে ভারতের অর্থনীতির জন্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ।’
সাবেক এই নৌ কর্মকর্তা যুক্তি দেন, নেভাল ব্লকেড বা নৌ অবরোধ জারি করা সহজ। কিন্তু তা ধরে রাখা কঠিন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকান—এত বড় একটি নৌবাহিনী হওয়া সত্ত্বেও তারা যদি একটি সরু জলপথের সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র নৌ অবরোধ বজায় রাখতে না পারে, তবে ভারতীয় নৌবাহিনী কীভাবে বিশাল ভারত মহাসাগর অবরুদ্ধ করবে?’
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সিনহা মনে করেন, এই দ্বীপের উন্নয়ন কৌশলগতভাবে ভারতের জন্য একটি বড় সম্পদ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘মালাক্কা প্রণালির কাছে এমন একটি অগ্রবর্তী অবস্থান (অ্যাডভান্স পজিশন) ভারত মহাসাগরে ভারতের নজরদারিকে আরও স্পষ্ট ও স্বচ্ছ করে তুলবে।’ তবে মনিষ চান্ডি নিশ্চিত, এই প্রকল্পের জন্য গ্রেট নিকোবর তথা ভারতকে যে মূল্য চোকাতে হবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এখানে মূল লক্ষ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সম্প্রসারণ নয়; বরং এটি এমন একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব, যার ফলাফল সন্দেহজনক এবং যার প্রভাব ধ্বংসাত্মক হতে পারে।…এটি ভারত ও তার প্রতিরক্ষার জন্য উল্টো একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।’