• বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ অপরাহ্ন
Headline
অবশেষে ইন্টার মিলানেই থেকে গেলেন আর্জেন্টাইন তারকা লাউতারো মার্টিনেজ খেলার মাঝে বিরতি দিয়ে মেসিকে অভ্যর্থনা জানাবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন মান্নান ও ফাতেমা জেলে বসেই এমবাপ্পেকে অপহরণের পরিকল্পনা বুন্দেসলিগার গোলমেশিন হ্যারি কেইন খেলোয়াড় বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ আয়ের নতুন রেকর্ড এখন চেলসির নভেম্বরে সিঙ্গাপুরে চার দলের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল- জাপান ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব দেখা যাবে আগামীকাল নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সোনু সুদ শতবর্ষেও ফুরায়নি বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জাদু

শতবর্ষেও ফুরায়নি বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জাদু

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রভাত বিনোদন: বাংলা চলচ্চিত্রে নায়ক এসেছেন অনেক, সুপারস্টারও কম নন। তবে একটি জায়গায় এসে যেন সবাই একমত—‘মহানায়ক’ আজও একজনই, উত্তমকুমার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েছে, বদলেছে সিনেমার ভাষা, সিনেমা দেখার মাধ্যমও। কিন্তু তাঁর হাসি, চোখের ভাষা, সংলাপ বলার ভঙ্গি কিংবা পর্দায় উপস্থিতির আবেদন এতটুকুও ম্লান হয়নি। আজ ৩ সেপ্টেম্বর বাংলা চলচ্চিত্রের সেই মহানায়কের জন্মশতবর্ষ। ১৯২৬ সালের এই দিনে কলকাতার আহিরীটোলায় মামাবাড়িতে জন্মেছিলেন তিনি।
সুনিপুণ অভিনয়দক্ষতা, নিজেকে ক্রমাগত ভাঙার ক্ষমতা আর চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়ার সহজাত গুণ তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছিল। তাঁর সিনেমাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় সেই বৈচিত্র্য। সুচিত্রা সেনের বিপরীতে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর রোমান্টিক নায়ক থেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখার্জি—সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলেছেন অবলীলায়। ‘ঝিন্দের বন্দী’তে দ্বৈত চরিত্র, ‘চিড়িয়াখানা’য় ব্যোমকেশ বক্সী কিংবা ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র নাম ভূমিকায়ও তিনি একেবারে অন্য মানুষ।
এ কারণেই জন্মের এক শতাব্দী পরও তাঁর অনেক চরিত্র নতুন মনে হয়। জন্মশতবর্ষ ঘিরে কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে চলছে নানা স্মৃতিচারণা ও আলোচনা। কলকাতায় শুরু হচ্ছে চার দিনের বিশেষ আয়োজন, বছরজুড়েও তাঁকে ঘিরে থাকছে নানা কর্মসূচি। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর কাজ পৌঁছে দেওয়াও এসব আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
জন্মনাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, মা চপলা দেবী। উত্তর কলকাতার যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা অরুণের পরিবারেই ছিল নাট্যচর্চার পরিবেশ। পরিবারের সদস্যদের নাটকের দল ছিল, ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি খেলাধুলায়ও আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টানটা ছিল অভিনয়ের দিকেই। পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে একসময় কলকাতা পোর্ট কমিশনার্সের দপ্তরে কেরানির চাকরি নেন। চাকরি ছিল জীবিকার জন্য; কিন্তু স্বপ্ন ছিল সিনেমায় অভিনয় করার। সেই স্বপ্নের পথ মোটেও সহজ হয়নি।
১৯৪৭ সালে মুক্তি না পাওয়া হিন্দি ছবি ‘মায়াডোর’-এ একটি ছোট চরিত্রে কাজের সুযোগ পান। তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি নীতিন বসু পরিচালিত ‘দৃষ্টিদান’ (১৯৪৮)। তখনো তিনি অরুণ কুমার নামেই পরিচিত। পরের বছর ‘কামনা’য় প্রথমবার নায়ক হন। পর্দায় নায়ক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো ঠিকই; কিন্তু ছবিটি সফল হলো না।
এরপরও ব্যর্থতা পিছু ছাড়েনি। ‘মর্যাদা’, ‘সহযাত্রী’, ‘নষ্টনীড়’, ‘সঞ্জীবনী’—শুরুর দিকে একের পর এক ছবি দর্শক টানতে ব্যর্থ হয়। চলচ্চিত্রপাড়ায় তাঁর কপালে জুটেছিল ‘ফ্লপ মাস্টার’ তকমা। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার কথাও যে তাঁর মনে আসেনি, তা নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকে গিয়েছিলেন।
এই সময়েই অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে ধীরে ধীরে স্থায়ী হয়ে যায় তাঁর পর্দার নাম—উত্তমকুমার।
অবশেষে অপেক্ষার অবসান। ১৯৫২ সালে নির্মল দে পরিচালিত ‘বসু পরিবার’ বদলে দেয় উত্তমকুমারের ক্যারিয়ারের গতিপথ। ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। ছবিটি সাফল্য পায়, দর্শকের নজরে আসেন উত্তম।
পরের বছর এল সেই ছবি, যা শুধু উত্তমকুমারের ক্যারিয়ার নয়, বাংলা সিনেমার রোমান্টিক নায়ক-নায়িকার ধারণাই অনেকটা বদলে দেয়।
১৯৫৩ সালে মুক্তি পায় নির্মল দে পরিচালিত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। বিপরীতে সুচিত্রা সেন। এ ছবিতেই প্রথমবার একসঙ্গে দেখা যায় উত্তম ও সুচিত্রাকে। ছবিটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পরের বছর ‘অগ্নিপরীক্ষা’র সাফল্যের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি এই জুটিকে। শুরু হয় উত্তম-সুচিত্রা যুগ।
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন শুধু একটি সফল জুটি ছিলেন না, একটা সময়ে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির প্রেম ও রোমান্টিকতার পর্দার প্রতীক। তাঁদের দিকে তাকানো, অভিমান, হাসি, নীরবতা—সবকিছুতেই দর্শক যেন নিজেদের প্রেমের ভাষা খুঁজে পেতেন।
‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরী’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’—একের পর এক ছবিতে তাঁদের রসায়ন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা তৈরি করে।
বিশেষ করে ‘সপ্তপদী’র কৃষ্ণেন্দু ও রিনা ব্রাউন কিংবা ‘হারানো সুর’-এর অলোক ও রমা—চরিত্রগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকের স্মৃতিতে থেকে গেছে। তাঁদের ছবির গানও সেই রোমান্টিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
কিন্তু উত্তমকুমারকে শুধু সুচিত্রা সেনের বিপরীতে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়ের বড় একটি অংশই অদেখা থেকে যায়।
জনপ্রিয়তার চূড়ায় থেকেও একই ধরনের চরিত্রে নিজেকে আটকে রাখেননি উত্তম; বরং বারবার নিজের প্রতিষ্ঠিত ইমেজ ভাঙার চেষ্টা করেছেন।
তপন সিংহ পরিচালিত ‘ঝিন্দের বন্দী’তে তিনি অভিনয় করেন দ্বৈত চরিত্রে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে শক্তিশালী চরিত্রে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দুই অভিনেতার অভিনয়ের লড়াই আজও বাংলা সিনেমার আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। আর ১৯৬৬ সালে এল সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র অরিন্দম মুখার্জি—বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় তারকা। ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে এক সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে সেই তারকার সাফল্যের আড়ালে থাকা ভয়, সংশয়, আপস ও অপরাধবোধ।
পর্দার অরিন্দম আর বাস্তবের উত্তমকুমারের তারকাসত্তার মধ্যে মিল খুঁজেছেন বহু চলচ্চিত্রবোদ্ধা। নিজের তারকা-ইমেজের ছায়া আছে—এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করেও উত্তম অরিন্দমকে আলাদা মানুষ করে তুলেছিলেন। ‘নায়ক’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছবি হয়ে ওঠে।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আবার কাজ করেন ‘চিড়িয়াখানা’য়। এবার তিনি গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী। রোমান্টিক নায়কের পরিচিত শরীরী ভাষা সরিয়ে রেখে চরিত্রটির জন্য নিজেকে অন্যভাবে হাজির করেন।
‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’তে আবার একেবারে অন্য উত্তম। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবিয়াল অ্যান্টনির চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় জাতীয় স্বীকৃতি। ১৯৬৭ সালের ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ও ‘চিড়িয়াখানা’য় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হন তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগ চালুর পর প্রথম বিজয়ী ছিলেন উত্তমকুমার।
অভিনেতা পরিচয়েই তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয়; কিন্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে উত্তমকুমারের সম্পর্ক ছিল আরও বিস্তৃত। প্রযোজনা করেছেন, পরিচালনা করেছেন, সংগীত পরিচালনা করেছেন, গানও গেয়েছেন।
‘হারানো সুর’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম আলোচিত ছবি, একই সঙ্গে প্রযোজক উত্তমকুমারেরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অজয় কর পরিচালিত ছবিটি দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও স্বীকৃতি পায়।
পরিচালক হিসেবেও ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েছেন। ‘শুধু একটি বছর’, ‘বনপলাশীর পদাবলী’সহ একাধিক ছবির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগীত পরিচালনাতেও হাত দিয়েছেন। আবার ‘নবজন্ম’ ছবিতে নিজেই একাধিক গানে কণ্ঠ দেন। তাঁর পর্দার গানের সঙ্গে অবশ্য আরেক কিংবদন্তির নামও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্তের কণ্ঠ আর উত্তমের পর্দায় উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল বাংলা সিনেমার গানের অন্য এক জাদু। এমন অনেক গান আছে, যেগুলো শুনলেই আজও দর্শকের চোখে ভেসে ওঠে উত্তমের মুখ।
বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে ওঠার পর হিন্দি সিনেমাতেও কাজ করেন উত্তমকুমার। কিন্তু বাংলায় যে বিপুল সাফল্য পেয়েছিলেন, হিন্দি ছবিতে সেই সাফল্য সহজে আসেনি।
বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের ‘ছোটি সি মুলাকাত’ তাঁর জীবনে বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এটি ছিল তাঁর প্রযোজিত হিন্দি ছবি। বিপরীতে ছিলেন বৈজয়ন্তীমালা। বড় আয়োজনের ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। প্রযোজক হিসেবে আর্থিক চাপেও পড়েন উত্তম।
তবু হিন্দি ছবিতে কাজ থামিয়ে দেননি। পরে ‘অমানুষ’, ‘আনন্দ আশ্রম’-এর হিন্দি সংস্করণসহ আরও কিছু ছবির মাধ্যমে সর্বভারতীয় দর্শকের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পর্দায় তাঁর প্রেমিক-নায়কের ইমেজ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, উত্তমকুমারের ব্যক্তিজীবনও কম আলোচিত ছিল না।
১৯৪৮ সালে গৌরী দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন উত্তম। তাঁদের একমাত্র সন্তান গৌতম চট্টোপাধ্যায়। তখনো অবশ্য উত্তমকুমার ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর তারকাখ্যাতি বাড়তে থাকে, বাড়ে চলচ্চিত্রের ব্যস্ততা। ব্যক্তিগত জীবনেও আসে নানা টানাপোড়েন। একসময় গৌরী দেবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
এরপর অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় উত্তমকুমারের। পর্দায়ও তাঁরা ছিলেন জনপ্রিয় জুটি। ‘সোনার হরিণ’, ‘উত্তরায়ণ’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘লাল পাথর’, ‘মন নিয়ে’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’সহ বহু ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন তাঁরা।
পর্দার সেই সম্পর্ক একসময় ব্যক্তিজীবনেও গভীর হয়ে ওঠে। ষাটের দশকে সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন উত্তমকুমার। জীবনের শেষ প্রায় ১৭ বছর সেখানেই কাটান।
তারকাখ্যাতির আড়ালের এই ব্যক্তিজীবন ছিল তাই অনেক বেশি জটিল—ভালোবাসা, সম্পর্ক, পরিবার ও দায়িত্বের টানাপোড়েনে ভরা। পর্দায় নিখুঁত রোমান্টিক নায়ক হয়ে ওঠা মানুষটির নিজের জীবনও যেন কখনো কখনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম ঘটনাবহুল ছিল না।
উত্তমকুমারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্বাভাবিকতা। সংলাপ বলার ধরন, চোখের ভাষা, হাসি, নীরবতা—কোনোটাই যেন অভিনয় মনে হতো না। পর্দায় তিনি ‘নায়ক’ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন—এমনটা দর্শককে বুঝতে দিতেন না। নিজেও বিশ্বাস করতেন স্বাভাবিক অভিনয়ে। তাঁর অভিনয়দর্শন ছিল, ধরাবাঁধা ছক বা কৃত্রিম কণ্ঠে নয়, মানুষ যেভাবে কথা বলে, রাগ করে, ভালোবাসে কিংবা আবেগ প্রকাশ করে, চরিত্রকেও সেভাবেই পর্দায় তুলে ধরতে হবে।
উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ রায়ের মূল্যায়ন ছিল তাৎপর্যপূর্ণ—বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর মতো আরেকজন নায়ক পাওয়া কঠিন। ‘নায়ক’-এ তাঁকে পরিচালনা করতে গিয়ে উত্তমের অভিনয়ের সহজাত ক্ষমতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন রায়।
তবে শুধু অভিনয় নয়, উত্তমকুমারের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল বাঙালির জীবনযাপনেও। তাঁর চুলের ধরন, পোশাক, কথা বলার ভঙ্গি, হাসি, প্রেম নিবেদনের ধরন—সবকিছুই অনুসরণ করতেন দর্শকেরা। একটা সময় বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষের রোমান্টিক ও আধুনিক হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও যেন মিশে গিয়েছিল উত্তমের পর্দার ইমেজ।
একই সঙ্গে নারীদের কাছেও উত্তমকুমার হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নের নায়ক। এই জনপ্রিয়তা শুধু তারকাখ্যাতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ, জনপ্রিয় তারকা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যান। উত্তমের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। মৃত্যুর চার দশকের বেশি সময় পরও তাঁর ছবি নতুন করে দেখা হয়, তাঁর অভিনয় বিশ্লেষণ করা হয়, তাঁর প্রেম ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহল থাকে।
জীবনের শেষ সময়েও অভিনয়ে ব্যস্ত ছিলেন উত্তমকুমার। ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র শুটিং করছিলেন তিনি। শুটিং চলাকালে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন উত্তমকুমার। বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতায় নেমে আসে শোকের ছায়া। দক্ষিণ কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য হয়।
উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়ার একটি কথাই যেন পরবর্তী সময়ের বাস্তবতায় বারবার ফিরে এসেছে—বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমের মতো আরেকজন নায়ক পাওয়া কঠিন।
প্রয়াণের ৪৬ বছর পর আজ যখন উত্তমকুমারের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে, তখনো ‘মহানায়ক’ বলতে বাঙালির সামনে ভেসে ওঠে সেই একটি মুখ।
জন্মশতবর্ষে মহানায়ককে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর আয়োজন করেছে ‘শতবর্ষে মহানায়ক’। ৩ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর চার দিনের মূল আয়োজনের পাশাপাশি বছরজুড়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, পুরোনো ছবি পুনরুদ্ধার, প্রদর্শনী, আলোচনা, পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সংগীতের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছেও উত্তমকুমারের কাজ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আজ সকালে টালিগঞ্জে উত্তমকুমারের ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হবে কর্মসূচি। বিজলী সিনেমার সামনে মহানায়কের ছবি নিয়ে তৈরি বিশাল কাটআউট উন্মোচন করবেন সত্যজিৎ-পুত্র সন্দীপ রায়। সন্ধ্যায় নন্দন-রবীন্দ্রসদন চত্বরে হবে শোভাযাত্রা। গগনেন্দ্র প্রদর্শনশালায় থাকছে উত্তমকুমারকে নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী। একতারা মুক্তমঞ্চেও থাকছে জন্মশতবর্ষের আয়োজন। ৪ সেপ্টেম্বর হবে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। উত্তমকুমারের নামে প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রকেন্দ্রের কর্মসূচি রয়েছে। বিকেলে শুরু হবে তাঁর চলচ্চিত্রের বিশেষ উৎসব; উদ্বোধনী ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’। নন্দন, রাধা স্টুডিওসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হবে তাঁর আরও ছবি।
একই দিন ইন্ডিয়া পোস্ট উত্তমকুমারকে নিয়ে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করবে। রবীন্দ্রসদনে সম্মান জানানো হবে তাঁর সময়ের ও পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজন বর্ষীয়ান শিল্পী ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বকে। সন্ধ্যায় দেখানো হবে স্বপন দাস নির্মিত তথ্যচিত্র ‘মহানায়ক: আ সুপারস্টার জার্নি’।
৫ সেপ্টেম্বর আলোচনার বিষয় ‘নায়িকার চোখে উত্তমকুমার’ এবং ‘অ্যাক্টিং অব উত্তমকুমার’। বিভিন্ন প্রজন্মের অভিনেতা, অভিনেত্রী ও নির্মাতারা এসব আলোচনায় অংশ নেবেন। ৬ সেপ্টেম্বর সংগীতের মাধ্যমে মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন রয়েছে।
জন্মশতবর্ষের এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য শুধু অতীতের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে উত্তমকুমারের কাজ পৌঁছে দেওয়া। আয়োজকদের ভাষ্যেও উঠে এসেছে সেই লক্ষ্য—আজ থেকে আরও এক শ বছর পরও যেন নতুন প্রজন্ম একইভাবে তাঁকে স্মরণ করতে পারে।
জন্মশতবর্ষের ঠিক আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথায়ও উঠে এসেছে উত্তমকুমারের নাম। ৩০ আগস্ট রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এর ১৩৭তম পর্বে মহানায়ককে স্মরণ করেন তিনি।
উত্তমকুমারকে বহুমুখী অভিনেতা হিসেবে উল্লেখ করে মোদি বলেন, অসাধারণ সব চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শককে মুগ্ধ করেছিলেন এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। উত্তমের অভিনয়জীবনের শুরুর ব্যর্থতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একের পর এক ছবি ব্যর্থ হওয়ার পরও হাল না ছেড়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন উত্তম—এই অধ্যবসায়ের দিকটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর প্রসঙ্গও আসে তাঁর বক্তব্যে।
জন্মশতবর্ষ ঘিরে এত আয়োজন, এত স্মৃতিচারণা আসলে একটি প্রশ্নও সামনে আনে—উত্তমকুমারকে ঘিরে এই আবেগ এত বছর পরও কেন অটুট? কেন নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি সমান কৌতূহলের নাম?
উত্তমকুমারের বয়স হবে উনিশ। সেই সময় প্রথম উত্তমকে দেখেন সুপ্রিয়া দেবী। উত্তম ছিলেন পাড়ার হিরো, মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। ছিলেন সুপ্রিয়ার ভাইয়ের বন্ধু। কিন্তু উত্তম-সুপ্রিয়ার পরিচয় তখনো হয়নি।
উত্তমকুমারের বয়স হবে উনিশ। সেই সময় প্রথম উত্তমকে দেখেন সুপ্রিয়া দেবী। উত্তম ছিলেন পাড়ার হিরো, মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। ছিলেন সুপ্রিয়ার ভাইয়ের বন্ধু। কিন্তু উত্তম-সুপ্রিয়ার পরিচয় তখনো হয়নি।
এক শতাব্দী আগে আহিরীটোলায় জন্মেছিলেন অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। শুরুতে একের পর এক ব্যর্থতা, তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে ওঠা—তাঁর নিজের জীবনও যেন সিনেমার গল্প। কিন্তু শুধু সাফল্য দিয়ে উত্তমকুমারের দীর্ঘস্থায়ী আবেদন ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর সমসাময়িক অনেক তারকা ছিলেন, পরের দশকগুলোতেও বাংলা চলচ্চিত্র পেয়েছে বহু জনপ্রিয় নায়ক; কিন্তু ‘মহানায়ক’ অভিধাটির পাশে আজও যেন আর কোনো নাম বসেনি।
সময় বদলেছে, দর্শক বদলেছেন, বদলেছে সিনেমাও। সাদাকালো পর্দা থেকে সিনেমা চলে এসেছে মুঠোফোনের পর্দায়। তবু নতুন প্রজন্ম ফিরে যায় ‘সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘নায়ক’, ‘চিড়িয়াখানা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ কিংবা ‘অমানুষ’-এর কাছে। জন্মের ১০০ বছর পর সম্ভবত সেটিই উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় অর্জন—মহানায়ক চলে গেছেন, তাঁর জাদু ফুরায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category