প্রভাত অর্থনীতি: ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও বিক্রেতাদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। রবিবার (৩০ আগস্ট) কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম রাশেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা অর্থ উদ্ধারে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
অভিযোগের তালিকায় বহুল আলোচিত ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং ও আলেশা মার্টসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে রাখা বা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা, ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতারিত গ্রাহকরা বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিদপ্তরে এ পর্যন্ত সর্বমোট ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ দাখিল করেছেন। ভুক্তভোগী গ্রাহক ও বিক্রেতাদের দাখিল করা এসব লিখিত অভিযোগের বিপরীতে দাবিকৃত মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিজিটাল বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং গ্রাহকদের পাওনা অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া তদারকিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সংসদ সদস্য মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চান, ইভ্যালি বা আলেশা মার্টের মতো প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের যে হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে, তা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে সরকারের সরাসরি কী পরিকল্পনা রয়েছে।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ই-কমার্স খাতে অতীতের অনিয়মের কারণে গ্রাহকেরা গুরুতর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি জানান, ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি বা ডিবিআইডি চালুর ফলে এখন প্রতিটি বৈধ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের আইনি তথ্য সরকারের কাছে সংরক্ষিত থাকছে। এতে ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা ঠেকানো সহজ হচ্ছে।
একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে জমা পড়া ৫৮ হাজারের বেশি অভিযোগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা ফিরিয়ে আনতে আইনি ও প্রশাসনিক তদারকি অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
বাণিজ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণে মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ যে নোটিশ দেন, তাতেও ই-কমার্স খাতের ধারাবাহিক আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
নোটিশে বলা হয়, গত কয়েক বছরে দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকম, আলেশা মার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ বা আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি তদন্তে শুধু ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি, ধামাকা শপিং ও এসপিসি ওয়ার্ল্ড—এই চার প্রতিষ্ঠানের কাছেই গ্রাহক ও মার্চেন্টদের প্রায় ৩ হাজার ১২১ কোটি টাকার দায় থাকার তথ্য উঠে এসেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ই-কমার্স খাতের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার অভিযোগ দাখিল হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থের পরিমাণ কয়েক শ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২১ সালে সরকার ৪৯টি ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
নোটিশে আরও বলা হয়, ই-কমার্স খাতের সংকটের পর একই ধরনের ঘটনা এখন অনলাইন ট্রাভেল ও টিকিটিং খাতেও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ফ্লাইট এক্সপার্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ ফেরত না দেওয়া, সেবা বন্ধ করে দেওয়া এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতি ও অনলাইন লেনদেনের প্রতি জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে নোটিশে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।