প্রভাত অর্থনীতি: বাংলাদেশি সবজির বড় বাজারগুলো হচ্ছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরব ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানিতে ধস নামে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর একটি বাজারে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও অন্য দেশগুলোতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। শুধু তা–ই নয়, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপের একাধিক দেশেও বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি কমে গেছে।
একাধিক রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে ওই অঞ্চলে অন্যান্য পণ্যের মতো শাকসবজির চাহিদাও কমেছে। চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশে বাংলাদেশের শাকসবজি রপ্তানি কমেছে। তবে ইউরোপের তিনটি গন্তব্যে রপ্তানি কমে যাওয়ার মূল কারণ ভিন্ন। সেটি হলো বিমানভাড়া বেড়েছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালীন ফলমূল রপ্তানিও অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের রপ্তানিকারকেরা।
জানা গেছে, শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) নেতারা ঢাকা থেকে লন্ডন, রোম ও টরন্টো এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে শাকসবজি, ফলমূল ও পান পরিবহনের ভাড়া কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) চিঠি দিয়েছে। গত ১১ মে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, বিমানভাড়া না কমানো হলে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিতে টিকে থাকা যাবে না। এর ফলে দেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হবে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গণমাধ্যমকে জানান, সাধারণত বাংলাদেশ থেকে শীত মৌসুমে দিনে ৩৫ থেকে ৪০ টন শাকসবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমান। এর বাইরে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি এবং উত্তর আমেরিকায় কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশে রপ্তানি হয় বাংলাদেশের সবজি। বর্তমানে ১৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সবজি রপ্তানি করে। গ্রীষ্ম মৌসুমে অবশ্য শাকসবজি রপ্তানি কিছুটা কমে যায়। তবে তখন মৌসুমি ফলমূলের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরানে হামলা চালায়। ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। তারা ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, সৌদি আরব ও ইরাকে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ওই অঞ্চলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সব ফ্লাইট তথা বিমান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া সব ধরনের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান।
আলাপকালে একাধিক ব্যবসায়ী গণমাধ্যমকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট তথা বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ার পর থেকে একের পর এক শাকসবজি রপ্তানির ক্রয়াদেশ বাতিল হতে থাকে। নতুন করে ক্রয়াদেশও আসছিল না। এতে সৌদি আরব ছাড়া অন্য গন্তব্যগুলোতে রপ্তানি কমতে থাকে। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে সবজি রপ্তানি আবার বৃদ্ধি পায়।
সরকারি সংস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস জুলাই–এপ্রিলে দেশ থেকে মোট ৬ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের সবজি রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেশি থাকায় এখনো শাকসবজি রপ্তানি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যেও সৌদি আরবে ফ্লাইটের পাশাপাশি শাকসবজি রপ্তানি মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) এপ্রিলে রপ্তানি বেড়ে ১২ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগের মাসে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছিল ৯ লাখ ডলারের শাকসবজি।
কয়েকজন রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাতারে সবজি রপ্তানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। যুদ্ধের আগে দেশটিতে সপ্তাহে চার দিনে প্রায় ৬০ টন সবজি রপ্তানি হলেও এখন যাচ্ছে ৪০ টনের মতো। অন্যদিকে কুয়েতে আগে সপ্তাহে ৪ দিনে ২০ টন সবজি রপ্তানি হতো। এখন সপ্তাহে দুই দিনে ছয়–সাত টন সবজি যাচ্ছে। কুয়েতে তাদের নিজস্ব বিমান কুয়েত এয়ারলাইনস ছাড়া অন্য কোনো এয়ারলাইনস ফ্লাইট অপারেশন বা বিমান চালানোর অনুমতি পাচ্ছে না। বাহরাইনে রপ্তানি খুবই কম হচ্ছে। এর কারণ, সে দেশে পণ্য পরিবহনে বিমানের ভাড়া বেশি। বর্তমানে কেজিপ্রতি দুই ডলার ভাড়া। সে কারণে রপ্তানি কমেছে।
এদিকে কানাডার টরন্টোতে শাকসবজি রপ্তানি নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। এর কারণ বিমানভাড়া। যেমন গত জানুয়ারিতে বিমানে প্রতি কেজি সবজি পরিবহনে তিন থেকে সাড়ে তিন ডলার ভাড়া ছিল। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় ডলারে। অর্থাৎ কানাডায় প্রতি কেজি সবজি পরিবহনে ৩২০ টাকা ব্যয় বেড়েছে। এত ভাড়া দিয়ে পণ্য নিতে চান না কেউ। এই সুযোগে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে যুক্তরাজ্য ও ইতালির রোমেও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের শাকসবজি। এর কারণ, এমিরেটস এয়ারলাইনসে প্রতি কেজি সবজি পরিবহনের ভাড়া চার ডলার হলেও সংস্থাটি নিচ্ছে ৪ দশমিক ৭ ডলার। এতে রোমের বাজারে সবজি রপ্তানি কমে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে কানাডায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ডলারের শাকসবজি রপ্তানি হয়। পরের মাসে সেটি কমে ২ লাখ ৩০ হাজার ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে রপ্তানি হয় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের সবজি।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যে ১৬ লাখ ডলারের শাকসবজি রপ্তানি হয়। পরের দুই মাসে তা কমে হয় যথাক্রমে ১২ ও ১০ লাখ ডলার। ফেব্রুয়ারিতে জার্মানিতে ৪৫ লাখ ডলারের শাকসবজি রপ্তানি হয়। পরের মাসে তা কমে হয় ১৩ লাখ ডলার। গত এপ্রিলে দেশটিতে রপ্তানি হয় ৩১ লাখ ডলারের শাকসবজি। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতে ৪ লাখ ৪৩ হাজার ডলারের শাকসবজি রপ্তানি হয় ইতালিতে। পরের দুই মাসে কমে হয়ে যথাক্রমে ২ লাখ ৪২ হাজার ও ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলে শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিএফভিএপিইএর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১০–১২টি গন্তব্যে নজর দিলে সবজি রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিমানসহ অন্যান্য এয়ারলাইনসের ভাড়া যদি সহনীয় রাখা হয়, তাহলেই এটি সহজে করা সম্ভব। সামনে আম–কাঁঠাল–লিচুর ভরা মৌসুম। বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে, তাতে এবার রপ্তানি কম হতে পারে। অথচ গত বছর কাতারে ফল উৎসবে আমরা অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছি। বাংলাদেশের আম কিনতে কত মানুষ ভিড় করেছে।’