প্রভাত রিপোর্ট: টানা ভারী বর্ষণের পর আগের দিনের তুলনায় সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীতে জলাবদ্ধতা অনেকটা কমেছে। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় কিছু কিছু এলাকায় পানি পুরোপুরি সরেনি। ফলে সেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে, তাই যান চলাচলেও দেখা দিয়েছে ধীরগতি। এ কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের পর রবিবার (১২ জুলাই) রেকর্ড বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। ২০০৯ সালের ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার সেই প্রবল বর্ষণে সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানি জমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সেসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, আগের দিনের তুলনায় অনেক এলাকার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, মিরপুর, ইসিবি চত্বর, বনানী, কাকলী, খিলক্ষেত, পুরান ঢাকার কিছু স্থানে পানি জমে রয়েছে। এই জলাবদ্ধতা, ধীরগতির যান চলাচল এবং দীর্ঘ যানজটের কারণে অফিসগামী মানুষ ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে গণপরিবহনের সংকট এবং রিকশা-সিএনজির অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেককে গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে হেঁটেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হন।
টঙ্গী থেকে গুলশানে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে এক বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, রবিবার বনানী ফ্লাইওভার থেকে নামার পর চারদিকে শুধু পানি আর পানি ছিল। আজও কাকলী এলাকায় কিছুটা পানি জমে ছিল, তবে গতকালের মতো ভয়াবহ নয়।
পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের আলীনেকি দেউড়ি এলাকার ভাড়াটিয়া শিশির আহমেদ বলেন, রবিবারের ভারী বৃষ্টিতে এখানে কোমরসমান পানি জমেছিল। রাতে পানি নেমে গেলেও সোমবার সকালে আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় নতুন করে পানি জমতে শুরু করেছে, যদিও এখনো রবিবারের মতো পরিস্থিতি হয়নি। একই এলাকার আগামাসি লেনের বাসিন্দা ফাইজুস সালেহিন খান নাহিন বলেন, গতকালও এই এলাকায় পানি জমেছিল। সোমবার সকাল থেকে আবার বৃষ্টি হওয়ায় ধীরে ধীরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এদিকে, পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এতে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
রবিবারের ভারী বর্ষণের প্রভাব পড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেও। সোমবারও হাসপাতালের প্রধান সড়ক, জরুরি বিভাগের প্রবেশপথ, প্রশাসনিক ভবন, মর্গসংলগ্ন এলাকা ও বাগানসংলগ্ন স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা যায়।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ততম এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটক, হাসপাতাল ভবন, পরিচালকের কার্যালয় এবং মর্গসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের পাশাপাশি কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
মানিকদী এলাকা থেকে বনানীতে কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন মোহাম্মদ সজল মিয়া (৩০)। সোমবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি প্রতিদিন বাসে চড়ে অফিসে যাই। আজ গাড়িতে চড়লে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। তাই সকাল সকাল পায়ে হেঁটে রওনা করেছি। একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, এ তো আর নতুন নয়। তবে এর আগে আমি কখনো ইসিবি চত্বরে এত পানি জমতে দেখিনি। এবার দেখলাম ভিন্ন চিত্র। সরকারের একটা বড় ভূমিকা নেওয়া দরকার। না হলে যদি একটানা দুই-তিন দিন বৃষ্টি হয়, তবে ঢাকা শহরে বের হওয়া যাবে না।”
বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগের কথা উঠে আসে মিরপুর থেকে বাড্ডা রুটের বাসচালক মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের (৫০) কণ্ঠে। দুপুরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের দুর্ভোগ তো কাটছে না। যাত্রী পাচ্ছি না, আর যাত্রী পেলেও রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে দুর্ভোগের শেষ থাকে না। অন্যদিকে মালিকের গাড়ির জমা তো প্রতিদিন দেওয়াই লাগে। গাড়ি চালাতে না পারলে জমা দেবো কীভাবে, নিজের সংসার চালাবো কীভাবে। সকাল থেকে যেখানে দুই ট্রিপ মারি এখনো এক ট্রিপে যেতে পারলাম না। বেলা বাজে ১১টা।’
তিনি সরকারপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তো অনেক ভালো ভালো কাজ করছেন। রাস্তায় ক্যামেরা ফিট করেছেন (এআই), সিগনাল অমান্য করা যায় না। কিন্তু রাস্তায় যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেগুলো নিচ্ছেন না কেন? আমার সরকারের কাছে একটাই দাবি, দ্রুত রাজধানীর জলাবদ্ধতা যেন না হয় সেই ব্যবস্থা করবেন। রাস্তা ভাঙ্গাচোরা হলে গাড়ি চালানো যায়, কিন্তু জলাবদ্ধতা হলে গাড়ি চালানো যায় না, গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়, যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়ে। মোটরসাইকেল, সিএনজি, প্রাইভেটকার বেশি নষ্ট হয় রাস্তায় পানি জমলে। পুলিশ এসে আমাদের বড় গাড়ি দেখে আমাদের ওপর দোষ চাপায় এবং মামলা করে, আমাদের দোষ কোথায়?”
বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় রিকশা চালাতে কষ্ট হয় জানিয়ে মিরপুর কালশী রোড এলাকার রিকশাচালক জব্বার মিয়া (৬০) গণমাধ্যমকে বলেন, “গতকাল যে পরিমাণে পানি হইছিল, আমার এই রিকশা চালানোর ১২ বছরে আমি এমনটা আর দেখি নাই। রাতে টিভিতে দেখলাম সারা ঢাকা শহর যেন খাল-বিল হয়ে গেছে! এখনো রাস্তায় পানি জমে আছে, সব রোডে গাড়ি চালানো যাচ্ছে না। তার ওপর সকাল থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হইছে। আমি প্যাডেলচালিত রিকশা চালাই, অনেক পানির ভেতরেও যাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু যাত্রী নিয়ে টানা যায় না। টেনে টেনে নিয়ে যেতে অনেক কষ্ট হয়।” তিনি আরও বলেন, “রাস্তায় খানাখন্দ আর তীব্র যানজট। দুই-চারটা ট্রিপ মারার পর আর শরীর চলে না, গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না। সকাল থেকে এই পর্যন্ত মাত্র দুইটা ট্রিপ মারতে পারছি।” আয় রোজগার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জলাবদ্ধতা হলে ইনকাম একটু বেশি হয়। কিন্তু অন্য দিনের তুলনায় পরিশ্রমও দ্বিগুণ হয়। বৃষ্টিতে গাড়ি চালানো যায় না। এমনকি অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। আপনারা তো শুধু বলেন রিকশাচালকরা একটু বৃষ্টি হলেই ডাবল ভাড়া নেয়, কেন নিই এইটা আর কেউ বলে না।”
ইসিবি চত্বরে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) মোহাম্মদ মতিন গণমাধ্যমকে বলেন, “রবিবার যে পরিস্থিতি গেছে সেটা আপনারা ভালো জানেন, সকাল থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবং গতকালের পানি এখনো কমেনি। সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে বারবার কথা বলা হয়েছে, তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। সারা ঢাকা শহরের একই অবস্থা। এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও সড়ক সচল রাখতে নিরলস কাজ করছেন আমাদের ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে, হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে ভাঙা রাস্তা ও জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন সচল রাখা আমাদের জন্যও এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও আমরা জনগণের স্বার্থে দেশের স্বার্থে সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
গুলশান জোনের টিআই মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “বনানী ও কাকলী এলাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। গতকালের জমে থাকা পানির ওপর আজ সকালের নতুন বৃষ্টি যোগ হওয়ায় এই রুটে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার প্রবেশমুখ—অর্থাৎ বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে যেসব যানবাহন খিলক্ষেত ও বনানী হয়ে ঢাকার ভেতরে প্রবেশ করছে, সেগুলোকে পড়তে হচ্ছে তীব্র যানজটের মুখে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকায় অসংখ্য প্রাইভেট কার, সিএনজি এবং মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে পানি ঢুকে সেগুলো মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে পেছনের বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনগুলো আটকে গিয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি করছে।” তিনি বলেন, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিকল হয়ে যাওয়া যানবাহনগুলো দ্রুত সরিয়ে রাস্তা সচল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।”
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা রাশেদ বিন খালেদ বলেন, আজ সকালের বৃষ্টিকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরে কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন এলাকায় সামান্য জলাবদ্ধতা রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো জরুরি পরিস্থিতির তথ্য আমাদের কাছে নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে রাজধানীর নিচু এলাকাগুলোতে আবারও জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।