প্রভাত রিপোর্ট: সরকার জেলা ও উপজেলায় ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিয়েছে, বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। জেলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি নতুন ডায়ালাইসিস বেড যুক্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান। আর জেলা সদর হাসপাতালে স্থাপন করা হচ্ছে ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেড। মানুষের সুবিধার্থে প্রতিটি উপজেলায় ১০টি করে ডায়ালাইসিস বেডের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কথাগুলো বলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী। ব্র্যাক আয়োজিত ‘সাসটেইনিং প্লে, লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ইন হিউম্যানিটারিয়ান কনটেক্সটস (স্প্ল্যাশ)’ উদ্যোগের উদ্বোধন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দেশে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্মের হার বাড়ছে, বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এর পেছনে কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, একদল দালাল মায়েদের ঘর থেকে এমন চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যায়, যারা সরাসরি অন্তঃসত্ত্বাদের অস্ত্রোপচারের কক্ষে নিয়ে যায়। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের পর শিশুদের মায়েদের শালদুধ খেতে দেওয়া হয় না। এটা শিশুদের পরবর্তী পুষ্টি ও ভিটামিনের ঘাটতির কারণ হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সিজারিয়ান অপারেশন একটি দালাল চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে। তারা আমাদের মায়েদের এমন চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যায়, যাঁরা সিজারিয়ান অপারেশন করেন।’স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনিসেফ এবং বেশ কিছু দাতাদেশের প্রতিনিধিদের বরাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার তথ্য পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য শেষ করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় এসেছে বলেন তিনি। এই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলেও জানান।
মন্ত্রী বলেন, মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে সরকার প্রসূতি সেবায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার (মিডওয়াইফ) এবং পরিচর্যাকারী নিয়োগ দেবে। যাঁরা আধুনিক স্ক্রিনিং মেশিন নিয়ে সরাসরি গ্রামীণ মায়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। চলতি বছরের মধ্যেই দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে আধুনিক প্যাথলজি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং চলতি মাসেই দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক জানায়, মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য ব্র্যাক-লেগো ফাউন্ডেশন ‘স্প্ল্যাশ’ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ও উগান্ডার চার লাখ শিশু পাবে খেলাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ।
উদ্বোধনী অধিবেশনে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, কক্সবাজারে অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সেখানে মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ, খেলাধুলা ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে ব্র্যাক। সংস্থাটি গত তিন বছর ধরে এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কম খরচে টেকসই মডেলের মাধ্যমে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, ওয়ান-রুম স্কুল এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনা করছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে খেলাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব এবং শিশুদের বিকাশে এর গুরুত্ব তুলে ধরেন ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির ঊর্ধ্বতন পরিচালক মো. আকরামুল ইসলাম। তিনি বলেন, কর্মসূচির আওতায় দেশের ৪৩টি জেলা ও সাতটি সিটি করপোরেশনে মা-শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ৬১টি জেলায় চক্ষুসেবা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিন লাখ মানুষকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খেলার ছলে প্রারম্ভিক শিশুবিকাশ ও মায়েদের মানসিক সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে সংস্থাটি।
সারা দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু উন্নয়নে ব্র্যাক এবং লেগো ফাউন্ডেশন কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন লেগো ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান তারেক আলামি।
রোহিঙ্গা কমিউনিটিতে ব্র্যাকের নতুন উদ্যোগ ভালোভাবে পরিচালিত হবে, সেই আশা প্রকাশ করেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ জাকারিয়া। এই উদ্যোগ যাতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পরবর্তী পরিচালনা করা হয় সে বিষয়ে দাতা সংস্থার কাছে আহ্বান জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
আয়োজকেরা জানান, বর্তমানে বিশ্বে ৪৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশু সংঘাত ও মানবিক সংকটের মধ্যে বসবাস করছে। এর মধ্যে ৫ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এসব এলাকায় শিক্ষা, সুরক্ষা ও মানসিক-সামাজিক সহায়তার সুযোগ খুবই সীমিত। এই বাস্তবতায় ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশন পাঁচ বছর মেয়াদি পাঁচ কোটি মার্কিন ডলারের অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও উগান্ডার চার লাখ শিশু-কিশোরকে সহায়তা দেবে। পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘স্প্ল্যাশ’ প্রকল্পের আওতায় জন্ম থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের খেলাভিত্তিক শিক্ষা, প্রাক্-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ, জীবনদক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, জীবিকায়নের সুযোগ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা জোরদার করা হবে।
শিশুদের জন্য খেলাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বের নানা দিক তুলে ধরেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইইডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইরাম মরিয়াম। ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন (গ্লোবাল) কর্মসূচির প্রধান ডা. রাফিয়াত রশীদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।