প্রভাত রিপোর্ট : দেশে বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র জ্বালানি সংকট বিরাজ করছে। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কমছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে শঙ্কা। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকখাতের চাপ, বৈশ্বিক সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা- সব মিলিয়ে অর্থনীতির চাপ যেন এসে পড়েছে শেয়ারবাজারে। দীর্ঘ মন্দার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ঘর পেরোনো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক মাত্র নয় কার্যদিবসে হারিয়েছে ২৬০ পয়েন্ট। একই সঙ্গে হাজার কোটি টাকার ওপরে থাকা লেনদেন নেমে এসেছে ৬০০ কোটি টাকার ঘরে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্পের চুল্লিতে জ্বালানি সংকটের যে আগুন জ্বলছে, তার উত্তাপ এখন সরাসরি পড়ছে শেয়ারবাজারে। জ্বালানিতে যেন জ্বলছে শেয়ারবাজারও। তাদের মতে, জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়, মুনাফা ও শেয়ারের দামে। ফলে অর্থনীতির দুর্বলতার প্রতিফলন হিসেবে শেয়ারবাজারেও চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নতুন আইপিও না আসা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর স্বল্পতা ও ভালো কোম্পানির সংকটও বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা বাড়িয়ে তুলছে।
দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসই’র প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স নেমে আসে ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে। পরে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দেয়। ধারাবাহিক উত্থানে একপর্যায়ে সূচক ৫ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে যায়। কিন্তু সেই উত্থানের ধারায় আবারও ছন্দপতন। সম্প্রতি টানা দরপতনের পাশাপাশি কমেছে লেনদেনও। গত ১১ আগস্ট ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্ট। ২৪ আগস্ট লেনদেন শেষে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৪৩ পয়েন্টে। অর্থাৎ নয় কার্যদিবসে সূচক কমেছে ২৬০ পয়েন্ট। এ সময়ে আট কার্যদিবসেই সূচকের পতন হয়েছে। এর মধ্যে শেষ দুই কার্যদিবসে শেয়ারবাজারে এক প্রকার ধস নামে। সোমবার (২৪ আগস্ট) ডিএসইতে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ে। বিপরীতে দাম কমে ৩৫৫টির। আগের দিন রোববার ৩২টি প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়ার বিপরীতে ৩২৪টির দাম কমে।
বড় ধরনের দরপতনের পাশাপাশি লেনদেন খরাও দেখা দিয়েছে বাজারে। হাজার কোটি টাকার ওপরে থাকা লেনদেন কমে নেমে এসেছে ৬০০ কোটি টাকার ঘরে। সর্বশেষ ছয় কার্যদিবসের কোনো দিনই ডিএসইতে হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়নি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা। জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন কমছে, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে, ব্যাংকখাতে চাপ রয়েছে, বৈশ্বিক সংঘাত জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভালো কোম্পানির সংকট ও দীর্ঘদিনের আইপিও খরা। তাদের মতে, শুধু সূচক বাড়িয়ে শেয়ারবাজারকে টেকসইভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, ব্যাংকখাতের দুর্বলতা কাটানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনা, আইপিওর স্বাভাবিক ধারা ফিরিয়ে আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরই নির্ভর করছে বাজারের ভবিষ্যৎ। তারা বলছেন, শেয়ারবাজার মূলত অর্থনীতির আয়না। সেই অর্থনীতির শিল্পকারখানা যখন জ্বালানি সংকটে ৩০-৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে, তখন তার উত্তাপ শেয়ারবাজারে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই বর্তমান পতন শুধু সূচকের কয়েকশ পয়েন্ট কমে যাওয়া নয়, বরং দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আস্থার সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। অর্থনীতির চাকা সচল হলে, কোম্পানির আয় বাড়লে এবং বাজারে নতুন ও ভালো কোম্পানির প্রবেশ নিশ্চিত হলে সেই আয়নাতেই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর ছবি দেখা যেতে পারে।
শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক মন্দার অন্যতম কারণ হিসেবে জ্বালানি সংকটকে দেখছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আশিকুর রহমান।
সাইফুল ইসলামের মতে, গ্যাস ও তেলের সংকটে দেশের মিল-কারখানাগুলো সক্ষমতার বড় অংশ কাজে লাগাতে পারছে না। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাচ্ছে, অনেক কারখানা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ফলে উৎপাদন কমে গেলে তাদের ব্যবসা, আয় ও মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন আশঙ্কা থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের সঙ্গে ব্যাংকখাতের চাপ যুক্ত হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ ঋণের মান নিয়ে প্রশ্নের কথা বলেছেন। শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে গেলে কোম্পানিগুলোর ব্যাংকঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমে যায়। এতে ব্যাংক ও শিল্প দুই খাতেই চাপ বাড়ে।’ অন্যদিকে আশিকুর রহমান মনে করেন, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বালানি সংকট নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় শিল্প ও উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশল ও উৎপাদন খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস নিয়ে বিনিয়োগকারীদের স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তিনি সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতাকেই বাজারের বর্তমান সংশোধনের অন্যতম কারণ মনে করছেন। আশিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি কমছে, মানুষের ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো তুলনামূলক উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় শেয়ারবাজারের বর্তমান মূল্যায়ন কিছুটা বেশি হয়ে গেছে।’
সূচকের পাশাপাশি লেনদেন কমে যাওয়াকেও বাজারের দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আশিকুর রহমান বলেন, ‘কিছুদিন আগে ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন হাজার কোটি টাকার ওপরে উঠেছিল। এখন তা আবার ৬০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। এর অর্থ হলো কিছু বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে মুনাফা তুলে বাজারের বাইরে অবস্থান নিয়েছেন।’ তবে তিনি মনে করেন, ‘বাজারে ভালো ধরনের সেল-অফ হলে এসব বিনিয়োগকারী আবার ফিরতে পারেন। কারণ তখন শেয়ারের মূল্যায়ন তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।’
ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে নতুন চাহিদা তৈরির জন্য নতুন বিনিয়োগকারী ও ভালো বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। শুধু বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি গতি তৈরি করা কঠিন।’
শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো নতুন আইপিওর অনুপস্থিতি। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষায়, আইপিও হচ্ছে শেয়ারবাজারের ‘নতুন রক্ত’। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশে নতুন কোনো আইপিও আসেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে টেকনো ড্রাগস আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এরপর আর কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসেনি। সাইফুল ইসলাম মনে করেন, ভালো ও বিনিয়োগযোগ্য কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে দ্রুত আইপিও প্রক্রিয়া সচল করা জরুরি। শুধু আইপিও নিয়ে আলোচনা করলে হবে না, কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সমস্যাকে আরও গভীর বলে মনে করছেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কার্যত কোনো আইপিও না থাকায় শেয়ারবাজার তার অন্যতম প্রধান কাজ কোম্পানিগুলোর মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি ঠিকভাবে করতে পারছে না। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার সুযোগও কমে গেছে।’
বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩৮৭টি। এর মধ্যে ১১৮টিই পচা বা ‘জেড’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। এর বেশিরভাগই বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয় না। বিপরীতে ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা ১৯৫টি। আর ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠান ৭৪টি। অর্থাৎ তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় অর্ধেক দুর্বল কোম্পানি।
আইপিও’র ঘাটতির সঙ্গে বাজারে ভালো ও বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংকটকেও বড় সমস্যা মনে করছেন সাইফুল ইসলাম। তার মতে, ‘ভালো কোম্পানির শেয়ারে সাধারণত বড় ধরনের দরপতন হয় না। স্কয়ার ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক কিংবা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মতো ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে। তাই বাজারে ভালো কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।’ আশিকুর রহমানের বক্তব্যেও এর সঙ্গে মিল রয়েছে। তিনি বলেন, নতুন আইপিও’র স্বাভাবিক চক্র ফিরলে বাজারে নতুন কোম্পানি, নতুন শেয়ার ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এতে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা কিছুটা কাটতে পারে।
সুদের হার কমলে সাধারণত ব্যাংক আমানত বা ঋণের তুলনায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ার কথা। কিন্তু এবার তেমনটা দেখা যাচ্ছে না। সাইফুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংকগুলোতে সুদের হার এখনো কার্যকরভাবে কমেনি। সামনে সুদের হার আরও কমলে শেয়ারবাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে আশিকুর রহমানের মতে, শুধু সুদের হার কমানোই যথেষ্ট নয়। অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি দুর্বল থাকলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে আগ্রহী হবেন না। কারণ যে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হবে, সেটি ভবিষ্যতে কতটা লাভ করবে সেই প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয়টিও শেয়ারবাজারের জন্য উদ্বেগের বলে মনে করেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। বর্তমানে জ্বালানি সংকট, কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর তাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠাচ্ছে।’
গ্যাস সংকটের কারণে ফু-ওয়াংয়ের কর্মীদের লে-অফের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি যদি জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মুখে পড়ে, তাহলে সেটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।’
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও শেয়ারবাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও তেলের বাজারের অস্থিরতা নিয়ে সতর্ক করেছেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম একপর্যায়ে ৯৫ ডলারের ওপরে উঠেছিল। পরে কিছুটা কমলেও আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য উচ্চ জ্বালানি মূল্য বড় ঝুঁকি।’
সাইফুল ইসলামও বৈশ্বিক যুদ্ধ ও নানা সংকটকে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টিকারী কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ‘এসব সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারেও প্রতিফলিত হবে।’