খান সুমন,কচুয়া: বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার ৬৩ নং শ্যনপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) গঠনে ব্যাপক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও সরকারি পরিপত্র লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনজনা রানী বেপারীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক সভা বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছেমতো ‘পকেট কমিটি’ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ অভিভাবকরা। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয় কমিটির নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর তা সাধারণ মানুষ বা অভিভাবকদের অবগতির জন্য তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়নি। এমনকি বিদ্যালয়ের প্রধান অংশীজন তথা স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে কোনো ধরনের সমন্বয় সভাও করা হয়নি। সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে নির্বাচনী প্রক্রিয়া পার করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎসাহী সদস্য মনোনয়নের জন্য কোনো সভা ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের পছন্দমতো নামের তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ এর পায়তারা করেছেন।
গত ২০ জুন ২০২৬ তারিখে একটি অভিভাবক সভা আহ্বান করা হলেও, নিয়ম অনুযায়ী কোনো অভিভাবককে লিখিত চিঠি বা পত্রের মাধ্যমে অবহিত করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ১১০ জন হলেও, চিঠির অনুপস্থিতির কারণে ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪২ জন অভিভাবক। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভোটারদের কোরাম (ফোরাম) পরিপূর্ণ না হলে সভা মুলতবি করার বিধান থাকলেও, তা অমান্য করে ওই একই সভায় সম্পূর্ণ মনগড়াভাবে চারজন অভিভাবক সদস্য নির্বাচন করা হয়। এছাড়া কোনো প্রকার বৈধ সভা ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মনোনয়ন ফি ধার্য করার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারি পরিপত্রের ১.১২ ধারা অনুযায়ী—এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, উচ্চশিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সমাজের সর্বজনগ্রাহ্য সম্মানিত ব্যক্তিদের মতামত ও প্রার্থী হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্থানীয় যোগ্য ব্যক্তিদের না জানিয়ে একজন স্বল্প শিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীকে ওই পদে মনোনীত করেছেন।
সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট (সেবা) এলাকার বাইরে থেকে একজন নারীকে এনে সভাপতি হিসেবে প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে। ওই নারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও স্থানীয়দের মনে গভীর সন্দেহ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রস্তাবিত নির্বাচনী তফসিলের তারিখের সাথে কমিটি গঠনের বাস্তব তারিখের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। তফসিলে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ ছিল ২০/০৬/২০২৬ ইং, অথচ রহস্যজনক কারণে কমিটি গঠনের জন্য তথাকথিত নির্বাচন দেখানো হয়েছে ০৫/০৭/২০২৬ ইং তারিখে, যা সম্পূর্ণ বিধি-বহির্ভূত।
অনিয়মের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অনজনা রানী বেপারী বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তিনি দাবি করেন, “আমি যা করেছি, সকলের মতামত ও আবেদনের ভিত্তিতেই করেছি।” যদিও তার এই দাবির পক্ষে কোনো বৈধ নথিপত্র বা রেজুলেশন দেখাতে পারেননি তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো: মিজানুর রহমান পাইক জানান, ”আমরা এখনও লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে লিখিত আকারে অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রস্তাবিত কমিটি বাতিল করে প্রয়োজনে নতুন করে বিধি মোতাবেক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হবে। এদিকে বিদ্যালয়টিকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের হাত থেকে বাঁচাতে এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে স্থানীয় বাসিন্দা ও বঞ্চিত অভিভাবকরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত প্রস্তাবিত কমিটি বাতিল করে নতুন করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠনের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। এই বিষয়ে দ্রুতই একটি লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।