মো. বাবুল শেখ,পিরোজপুর: একটি মেয়ের বিয়ে মানেই বাবার হাত ধরে বিদায়, মায়ের অশ্রুসজল চোখ আর স্বজনদের ভালোবাসায় ঘেরা এক আবেগঘন মুহূর্ত। কিন্তু যাদের মাথার ওপর নেই বাবা,মায়ের স্নেহের ছায়া, তাদের জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ দিনে অভিভাবকের ভূমিকায় কে থাকেন? সেই প্রশ্নের এক হৃদয়স্পর্শী উত্তর মিলেছে পিরোজপুরে।
প্রথমবারের মতো সরকারি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা এক এতিম কন্যার বিয়ের সম্পূর্ণ আয়োজন করেছে জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর। শুধু আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তারা, কনের অভিভাবকের দায়িত্বও পালন করেছেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ। মানবিকতার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। রবিবার (১২ জুলাই) রাতে পিরোজপুর সরকারি শিশু পরিবার ক্যাম্পাসে উৎসব, আনন্দ আর আবেগঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় সুহানি আক্তারের বিয়ে। আলোকসজ্জা, শুভেচ্ছা আর আন্তরিকতায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবার। যে প্রাঙ্গণে এতদিন সুহানির শৈশব,কৈশোর কেটেছে, সেখান থেকেই শুরু হলো তাঁর নতুন জীবনের পথচলা।
অনুষ্ঠানে কনের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ। তিনি কনে সুহানি আক্তারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরের হাতে তুলে দেন এবং নবদম্পতির সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধ দাম্পত্য জীবনের জন্য শুভকামনা জানান। অভিভাবকহীন এক কন্যার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা প্রশাসকের এই ভূমিকা উপস্থিত সবার মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
জানা যায়, পিতামাতাহীন সুহানি আক্তার ২০১৫ সালে সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। সেখানেই বেড়ে ওঠেন, পড়াশোনা করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে থাকেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পিরোজপুর সদর উপজেলার জুজখোলা গ্রামের রাকিব শেখের সঙ্গে এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান, সদস্য সচিব সাইদুল ইসলাম কিসমত, সমাজসেবা অধিদপ্তর পিরোজপুরের উপপরিচালক মো. ইকবাল করিম, সরকারি শিশু পরিবারের উপ-তত্ত্বাবধায়ক শাবানা খানমসহ জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।
বিয়েকে ঘিরে সরকারি শিশু পরিবারে ছিল উৎসবের আমেজ। সেখানে বসবাসরত এতিম ও দুস্থ শিশুরা তাদের সহপাঠীর নতুন জীবনের সূচনাকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে। কেউ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়, কেউ হাসিমুখে বিদায়ের মুহূর্তের সাক্ষী হয়। হাসি, শুভেচ্ছা আর আবেগে মুখর হয়ে ওঠে পুরো শিশু পরিবার ক্যাম্পাস।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অভিভাবকহীন শিশুদের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান।
পিরোজপুরে সরকারি শিশু পরিবারের ইতিহাসে এই আয়োজন শুধু একটি বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবিক দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্ব এবং এতিম শিশুদের প্রতি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সমাজের অসহায় ও অভিভাবকহীন শিশুদের প্রতিও যে রাষ্ট্র স্নেহ, মর্যাদা ও নিরাপত্তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে সুহানির বিয়ে সেই বার্তাই নতুন করে পৌঁছে দিল সবার কাছে।