মো. নজরুল ইসলাম , গাইবান্ধা : গত সোমবার দিবাগত রাতে পাগল কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া আফরুজা বেগমের বড় ছেলে মোনারুল ইসলাম বলেন, তার মাকে বাঁচানোর জন্য আক্রান্ত হওয়ার পরপরই গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, এখানে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন নাই। সাথে সাথে তার মাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেও ডাক্তার একই কথা বলেন, হাসপাতালে ভ্যাকসিন নাই। পরে বাধ্য হয়ে বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে মায়ের চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু তারপরও মাকে বাঁচাতে পারেননি। তিনি বলেন হাসপাতালে ভ্যাকসিন থাকলে এবং তা যথাসময়ে দিতে পারলে হয়তো মাকে বাঁচানো যেত। হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকার কারনে এবং সুচিকিৎসার অভাবে তার মাকে হারাতে হয়েছে। এভাবে চলে গেল পাঁচটি প্রাণ। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ এ দায় এড়াতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা ওয়ার্ড বয় এবং নার্সরা তার সাথে অনাকাঙ্খিত আচারণ করেছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পাগল কুকুরের কামড়ে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাড়িছে পাঁচজনে। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১১ জন। সর্বশেষ বুধবার ১২টার দিকে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের সুলতানা বেগম নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। এনিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাড়াল পাঁচজনে। মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। দীর্ঘ এক বছর ধরে হাসপাতালে ভ্যাকসিন নাই, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নিরব ভুমিকা এলাকার সচেতন মহলকে আহত করে তুলেছেন। আক্রান্তদের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। যাদের মৃত্যু হয়েছে তারা হলেন- নন্দরানী, ফুল মিয়া, রতনেশ্বর, আফরুজা বেগম ও সুলতানা বেগম।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ এপ্রিল সকালে উপজেলার বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে। স্থানীয় সাইদুর রহমান বলেন, সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ধর্মপুর এলাকা থেকে দ্রুত গতিতে একটি কুকুর এসে বিষ্মুময়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নন্দ রানীর মুখে কামড় দেয়। এরপর এক এক করে বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ১৫ জনকে কামড় দেয়। সর্বশেষ কামড় দেয় আতিকুর রহমানকে। সেই আতিকুর পরে কুকুরটিকে পিঠিয়ে মেরে ফেলে। আক্রান্তরা হলেন ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, গোলেনুর বেগম, মিতু বেগম, আতিকুর মিয়া, লাবন্য আকতার, বিজয় হোসেন, জয়নাল আবেদীন, চাদনী বেগম। উপজেলা প্রশাসন ও কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ নিহত ও আহতদের নামের তালিকা নিশ্চিত করেছেন।
সর্বশেষ বুধবার ১২টার দিকে কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া সুলতানা বেগমের স্বামী সালাম মিয়া বলেন, তার স্ত্রীর সুচিকিৎসার জন্য প্রথমে তিনি গাইবান্ধা হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় তিনি বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে তার শরীরে পুশ করে নেন। বাইরের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কেমন এটা তার জানা ছিল না। তার ধারনা সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন পেলে হয়তো তার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারত।
পাগল কুকুরের আক্রান্তের পর আক্রান্তরা সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতাল ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন না পাওয়ার বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে চিকিৎসা করছেন। এনিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের গাফিলতি, হাসপাতালে সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ না করা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসি।
আক্রান্তদের সাথে কথা বলে জানা, তারা এখন উৎকন্ঠার মধ্যে রয়েছেন। মৃত্যুর সারি বাড়তে থাকায় অনেকের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা মেডিকেল বোর্ড গঠন করে সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন। এলাকায় চলছে কান্নার রোল এবং শোকের মাতন।
বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নেম্বর তাজরুল ইসলাম বলেন, মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি। তিনি বলেন পাগল কুকুরের আক্রমনের খবর পেয়ে সকলের বাড়িতে ছুটে যান। সেই সাথে আক্রান্তদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেন। সেই সাথে আক্রান্তদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন সে মোতাবেক সকলে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে চলে যায়। কিন্ত অত্যন্ত কষ্টের বিষয় সেখানে কোন ভ্যাকসিন ছিল না। এরপর অনেকে রংপুর যায় এবং বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে চিকিৎসা শুরু করে। কুকুরটি সকলের নাকে, মুখে, এবং চোখে আক্রমন করেছে। এ কারনে অনেকে বেশি অসুস্থ হয়েছে।
কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার বলেন, দীর্ঘ এক বছর ধরে হাসপাতালে কেন ভ্যাকসিন সরবরাহ নাই, এ দায় কার? বুধবার ১২টার দিকে সুলতানা বেগম মারা যান। বিষয়টি এতটা ভয়াবহ আকার ধারন করবে সেটি তার জানা ছিল না। তিনি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের এবং জেলা প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার দিবাকর বসাক বলেন, দীর্ঘ দেড় বছর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোন প্রকার জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। পশু-পাখীর আক্রামনে এ ধরনের রোগী আসলে বাইর থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে চিকিৎসার পরামর্শ প্রদান করা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বহুবার ভ্যাকসিনের চাহিদা দেয়া হয়েছে। তিনি জরুরী ভিত্তিত্বে আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
উপজেলা নিবার্হী অফিসার ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাংবাদিকের মাধ্যমে জানার পর পরই স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমানের পরামর্শ ক্রমে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত ও আহতদের বাড়িতে গিয়ে তাদের খোজ খবর নেয়া হয়। সেই সাথে নিহত পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. রফিকুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন হতে হাসপাতালে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। যার কারনে সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা সম্ভাব হয়নি। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগকে কয়েক দফা জানা হয়েছে। তিনি বলেন, জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর মানুষকে কামড় দিলে, যথা সময় ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে পারলে তাকে বাঁচানো সম্ভাব।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেজিষ্টার ডাক্তার মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, গভীর রাতে রোগী ভর্তির বিষয়টি ওয়ার্ড বয় এবং নার্সরা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সে কারনে হয়তো, অনাকাঙ্খিত ঘটনাটি ঘটেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সেই সাথে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন সরবরাহ না থাকলে তো রোগীকে দেয়া সম্ভাব হবে না।
গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. মাজেদুর রহমান বলেন,বিষয়টি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সাংবাদিকের মাধ্যমে জেনে তাৎক্ষনিক ভাবে উপজেলা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে নিহত ও আহতদের বাড়িতে গিয়ে খোজ খবর নিয়েছেন এবং নিহতের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কথা বলেছেন। হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকার বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের দায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. আব্দুর রাজ্জাক বুধবার বিকাল সাড়ে চার টায় বলেন, যেসব এলাকায় এমন ঘটনা ঘটবে, সেখানে কুকুরকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। আমাদের ভ্যাকসিন নেই। তবে ওই সব এলাকায় জনগনকে সচেতন করতে মাইকদ্বারা গনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।