• বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ অপরাহ্ন

দেশি আমের বাজার বাড়লেও, রপ্তানি কম

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: দেশের বাজারে দিন দিন বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই ফল। তবে, ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে আমের রপ্তানিতে মিলছে না প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি। দেশি আমের বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হলেও প্রশাসনিক, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমের রপ্তানি হয়েছে ১০০ কোটি টাকারও কম। দেশে গত বছর ২ লাখ ৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হয়েছে ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন। দেশি আমের বাজার আনুমানিক ১৩ হাজার কোটি টাকার।
অন্যদিকে, গত বছর বিশ্বের ২৯টি দেশে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। সবকিছু হিসাবে নিলে এ থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে একশ কোটি টাকারও নিচে। অর্থাৎ, দেশে উৎপাদিত আমের সার্বিক বাজারের তুলনায় রপ্তানির হিস্যা খুবই নগণ্য।
বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় ভারতে। এরপর ইন্দোনেশিয়া, চীন, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও পাকিস্তানের অবস্থান। আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। ২০২৪ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এ পরিসংখ্যান যখন প্রকাশ করা হয়, তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী (বিবিএস) আম উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ৪২ হাজার টন। বর্তমান কৃষি অধিদপ্তরের যে উৎপাদনের তথ্য, তা সমন্বয় করলে এ অবস্থান শীর্ষ পাঁচের মধ্যে হবে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু, উৎপাদনে শীর্ষ দশে থাকলেও রপ্তানিতে শীর্ষ কোনো তালিকায় নেই বাংলাদেশের নাম। কয়েক বছর ধরেই রপ্তানির পরিমাণ ঘুরপাক খাচ্ছে মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার টনে। যেখানে বিশ্বে এখন আমের বাজার ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের। এতে বড় উৎপাদনকারী হয়েও বাংলাদেশের হিস্যা হয়ে গেছে যেন তিল পরিমাণ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, সরকারের কিছু উদ্যোগে বাংলাদেশ থেকে প্রায় লাখ টনের বেশি আম রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড প্রচুর আম রপ্তানি করে। এসব আমের স্বাদ ও মান বাংলাদেশের আমের সমজাতীয়। বরং, এ দেশের বেশকিছু জাত এই দেশগুলো থেকে অধিক সুস্বাদু। কিন্তু তারা (ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড) মানসম্মত নিরাপদ আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ায় তাদের আম রপ্তানি বেড়েছে হু হু করে, বাণিজ্যেও তাদের অবস্থান শীর্ষে।
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর (২০২৫) বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এর আগের বছর ২০২৪-এ হয়েছে ১ হাজার ৩২১ টন। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন আম রপ্তানি হয়েছিল। সেটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানির রেকর্ড। যেখানে ২০১৭ সালে দেশ থেকে মাত্র ৩০৯ টন আম রপ্তানি হয়েছিল।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ মোট ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করছে। যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, সুইডেনসহ আরও কিছু দেশে বাংলাদেশের আম যাচ্ছে। পাশাপাশি গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়। এ বছর নতুন করে মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের আম স্বাদে, গন্ধে ও পুষ্টিতে অতুলনীয় এবং এর চাহিদাও রয়েছে বিশ্বের অনেক দেশে। তবে এখন আম রপ্তানির বাজারটি বেশ প্রতিযোগিতামূলক। বিশেষ করে আমদানিকারক দেশগুলোর চাহিদা অনুসারে মানসম্মত আম উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা হচ্ছে না। পরিকল্পিতভাবে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে মানসম্মত নিরাপদ আম উৎপাদন হচ্ছে কম, যা রপ্তানির প্রথম শর্ত। এছাড়া কোয়ারেন্টাইন, আম উৎপাদনকারী, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, গবেষক এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বয়ের অভাবে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। যথাযথভাবে গ্রেডিং, প্যাকিং সুবিধার অভাব ও অ্যাক্রিডিটেশন ল্যাব না থাকার সমস্যাও রয়েছে দেশে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা, সব নিয়ম মেনে যতটুকু রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন হচ্ছে সেটাও রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না মাত্রাতিরিক্ত বিমান ভাড়ার কারণে।
এ দেশ থেকে আম রপ্তানিতে প্রতি কেজির বিমান ভাড়া প্রায় ৫০০ টাকার ওপরে। ফলে উৎপাদনের পর কোনো একটি দেশে আম পাঠাতে ৭০০ টাকার মতো খরচ হয়। এতে প্রত্যাশিত পরিমাণে আম বিদেশে পাঠাতে পারছেন না রপ্তানিকারকরা।
দেশের অন্যতম শীর্ষ আম ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংক। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, গত বছরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিমান ভাড়ার কারণে হয়নি। এ বছর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। আমরা খুব হতাশ। তিনি বলেন, কয়েকদিন হলো আমরা সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শুরু করেছি। তবে, শুরুতে উড়োজাহাজের ভাড়া বেড়ে সব রেকর্ড ভেঙেছে। বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো প্রতি কেজি আম যুক্তরাজ্যে পাঠাতে ৫০৫ টাকা নিচ্ছে। এর চেয়েও বড় সমস্যা একই দূরত্বে সরকারি বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের ভাড়া হচ্ছে ৫৮০ টাকা।
এ রপ্তানিকারক বলেন, বর্তমানে বাড়তি প্লেন ভাড়ার কারণে আম রপ্তানি করে খরচ পোষানো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বিমানে তো নয়ই। বেসরকারিতেও গত বছরের চেয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া বেড়েছে। আরও কয়েকজন রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রপ্তানিযোগ্য আম এবার বাগান থেকে সংগ্রহ করতেই প্রতি কেজিতে খরচ হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। এরপর বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকিং ও অভ্যন্তরীণ পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে প্রতি কেজিতে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৫০ টাকার বেশি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিমান ভাড়াই গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকার বেশি। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে উৎপাদন ও রপ্তানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি বাজারে বাংলাদেশের আমের দাম প্রতিযোগী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি পড়ছে, যা রপ্তানিতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত বছর এ খরচ মোট ৫০০ টাকার মধ্যে ছিল। বছর তিনেক আগে লাগতো ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
আম রপ্তানির ক্ষেত্রে প্লেন ভাড়ার প্রসঙ্গটি এখন সরকারেরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঈদের কয়েকদিন আগে চলতি বছরের আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য পাঠাতে প্লেন ভাড়া বেশি গুনতে হয়।
ওই অনুষ্ঠানে প্লেন ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মন্ত্রী হওয়ার আগে আমিও এ দুঃখের সঙ্গী ছিলাম। তখন কার কাছে যে বলি এই দুঃখের কথা, সে জায়গাটাও ছিল না। ওমুক সাহেবের কাছে গেলে বলে, এটা আমার কাজ নয়, তমুক সাহেবের কাছে দৌড়ান। এই সাহেবদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে পায়ের জুতা যে কত জোড়া ক্ষয়ে গেছে সে হিসেব নেই। এ সময় মন্ত্রী রপ্তানিকারকদের উদ্দেশে বলেন, এ বাস্তবতা আমি জানি। যে কারণে আমি আপনাদের কাছে কথা দিচ্ছি, কৃষিমন্ত্রী হিসেবে থাকতেই ইনশাআল্লাহ এ সমস্যার সমাধান হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্লেন ভাড়া কমানো ছাড়া রপ্তানির সুফল আনার কোনো সুযোগ নেই। আমিও একমত, পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে কার্গো ভাড়া বেশি। এটার সমাধান আমি খুঁজে বের করবো। তিনি বলেন, বিমান বাংলাদেশ এর মধ্যে বেশকিছু প্লেন কেনার চুক্তি করেছে। ওইসব প্লেন দেশে আসার আগেই আমাদের রপ্তানি আরও এগিয়ে যাবে। তখন অবশ্যই কার্গো ফ্লাইট চালু হবে।
প্লেন ভাড়া সাশ্রয়ী করতে কৃষি অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পও চেষ্টা চালাচ্ছে। উৎপাদনকালে আমের অন্যান্য সমস্যা সমাধানে এ প্রকল্পটি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে গত কয়েক বছর। যতটুকু আম রপ্তানি হচ্ছে, বলতে গেলে সেটা এ প্রকল্পেরই সুফল।
জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, আম রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে প্রকল্পের শুরু থেকে। যার সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান আম উৎপাদন অঞ্চল চিহ্নিত করা ও উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ, কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করে আম উৎপাদন ও জীবাণুমুক্ত এবং স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণে বেশ উন্নতি হয়েছে।
এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এবার আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। সেখানে রপ্তানি ব্যাহত হলে চাষিরা দাম পাবে না। নানা জটিলতায় গত দুই বছরও আম রপ্তানি ভালো হয়নি। এবার রপ্তানি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বড় উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, গবেষণা কার্যক্রম জোড়দার ও আধুনিক প্যাক হাউজ স্থাপনের মাধ্যমে আমের বাণিজ্যিক এলাকায় আম সংগ্রহ, সংগ্রহোত্তর কাজ এবং পরিবহনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। বর্তমানে দেশে ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম গত ৫ মে থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাজারে আসছে। এ পর্যন্ত বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক এবং ক্ষতির শঙ্কা করছেন না চাষিরা। তারা বলেন, রপ্তানি কম হলেও স্থানীয় বাজারে দাম ভালো থাকলে মুনাফা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category