…………………নজরুল ইসলাম…………………..
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্র শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জনগণের কণ্ঠস্বর, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম এবং সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করে। স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্রের বিকাশ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বিজ্ঞাপন আয়ের সংকোচন, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতিযোগিতার কারণে দেশের সংবাদপত্র শিল্প বর্তমানে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই জাতীয় বাজেটে সংবাদপত্র শিল্পের উন্নয়ন ও টিকে থাকার স্বার্থে বিশেষ প্রণোদনা রাখা সময়ের দাবি।এ শিল্প বাচঁলে গণমাধ্যমকর্মী ও জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বাচঁবে।
বাংলাদেশে সংবাদপত্র শিল্প দীর্ঘদিন ধরে জনমত গঠন, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদপত্র প্রকাশের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিউজপ্রিন্ট, কালি, প্লেট, যন্ত্রাংশসহ অধিকাংশ উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞাপন আয়ের বড় একটি অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে চলে যাচ্ছে। ফলে অনেক সংবাদপত্র আর্থিক সংকটে পড়েছে।
এ অবস্থায় সরকার যদি বাজেটে সংবাদপত্র শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করে, তাহলে শিল্পটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। প্রথমত, সংবাদপত্রে ব্যবহৃত কাগজ, কালি ও অন্যান্য উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর হ্রাস করা যেতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। পাঠকের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। সরকারের প্রণোদনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, সংবাদপত্র শিল্পে কর্মরত সাংবাদিক, মুদ্রণকর্মী ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। দক্ষ মানবসম্পদই একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমের ভিত্তি। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হলে সাংবাদিকতার মান আশা করা যায় আরও উন্নত হবে।
চতুর্থত, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের অনেক আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংবাদপত্র সীমিত আয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপনের সুষম বণ্টন তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে এবং স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদ পরিবেশনকে আরও শক্তিশালী করবে।
এছাড়া সংবাদপত্র শিল্পকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মতো বিশেষ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ সংবাদপত্র শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় দায়িত্ব পালন করে। এই শিল্পের দুর্বলতা দেশের তথ্যপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক চর্চাকে ব্যাহত করতে না পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় সংবাদপত্র শিল্পকে রক্ষা ও আধুনিকায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম মানে সচেতন নাগরিক সমাজ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং গণতন্ত্রের সুদৃঢ় ভিত্তি। তাই আগামী জাতীয় বাজেটে সংবাদপত্র শিল্পের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, কর-সুবিধা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে সংবাদপত্র শিল্প যেমন উপকৃত হবে, তেমনি দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়নের, ধারাও আরও শক্তিশালী হতে সহায়তা করতে পারে। এতে সাংবাদিক, মুদ্রণকর্মী ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিকভাবে উপকৃত হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, nazrulnews1970@gmail.com
(এই বিভাগের প্রতিটি লেখা লেখকের বাক স্বাধীনতার প্রতিফলন। এ লেখার দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এর জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। )