• রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৩ পূর্বাহ্ন
Headline
হোমনায় ডাকাত সন্দেহে গ্রেপ্তার, মুক্তির দাবিতে সড়ক অবরোধ রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে দেয়া কালি মুছে ভাইরাল রিকশাচালক সুপারিশকৃত বিচারকদের হবে ডোপ টেস্ট, বেঁধে দেয়া হলো সময় ভোটারের হাতের কালি শুকানোর আগেই ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করা হয়েছে: শামা ওবায়েদ ‘কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে’: কৃষিমন্ত্রী এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের ৩–৬ মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হবে: মাহদী আমিন সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে ডিএসসিসির বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রয়েছে : খাদ্যমন্ত্রী ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি নকল ও ভেজাল পণ্যে বাজার সয়লাব শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পাশাপাশি পাঠদানের কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করতে হবে : ববি হাজ্জাজ
সব আয়োজন করেন একাই

২৪ বছরে ১১৩ মেয়ের বিয়ে দিলেন নাটোরের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল

Reporter Name / ২১ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

প্রভাত সংবাদদাতা,নাটোর : প্যান্ডেলে ঘেরা বাড়ি। আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে কোনও কিছুরই কমতি নেই। ভেতরে মহাধুমধামে চলছে খাওয়াদাওয়া। ভোজন শেষে পাত্রীকে আশীর্বাদ করছেন অতিথিরা। সব মিলিয়ে বিয়ের বাড়িতে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
এই আয়োজন নওগাঁর মান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের ভ্যানচালক আফছার আলীর মেয়ে আফসানা মিমির (২০) বিয়ের। গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাটোর সদর উপজেলার সবুজ মণ্ডলের ছেলে কাউছার মণ্ডলের (২২) সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তবে বিয়ের এই আয়োজনের পেছনে যিনি ছিলেন, তিনি বর-কনের রক্তের কেউ নন। এমনকি দুই পরিবারের সঙ্গে আগে থেকে তার কোনও পরিচয়ও ছিলো না। তিনি নাটোরের বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিন রুবেল।
অসহায় পরিবারের মেয়েদের ঘটা করে বিয়ে দেওয়াই রুহুল আমিনের সবচেয়ে বড় শখ। এভাবে গত ২৪ বছরে ১১৩ জন মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন তিনি। বিয়ের উপহারসামগ্রীসহ যাবতীয় খরচ একাই বহন করেছেন।
কনে আফসানা মিমির বাবা আফছার আলী জানান, ভ্যান চালিয়ে কোনও রকমে সংসার চালান তিনি। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তাও করতে পারছিলেন না। লোকমুখে বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের কথা জানতে পেরে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং মেয়ের বিয়ের জন্য সহযোগিতা চান। রুহুল আমিনও বিয়ের সব আয়োজনের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন।
কিছুদিনের মধ্যেই নাটোর সদর উপজেলার কাউছার মণ্ডলের সঙ্গে আফসানার বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত করেন রুহুল আমিন। এরপর নিজে উপস্থিত থেকে গায়েহলুদের পোশাক, বর-কনের বিয়ের পোশাক, গয়নাপত্র, উপহারসামগ্রী, সাজসজ্জা ও খাবারের আয়োজন করেন। এসবের যাবতীয় খরচও বহন করেন তিনি।
আফসানা মিমি বলেন, মেয়ের বিয়ে দেওয়া নিয়ে তার বাবা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। অর্থসংকটের কারণে পাত্রও দেখতে পারছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে রুহুল আমিন নিজের মেয়ের মতো করে তার বিয়ের আয়োজন করেছেন। সমাজে এমন মানুষ থাকতে পারেন, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। এ জন্য রুহুল আমিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বর কাউছার মণ্ডল বলেন, আমি সৌভাগ্যবান, এমন একটি বিয়ের বর হতে পেরে। রুহুল আমিন আমার বিয়ের উকিল বাবা হয়েছেন। আমার স্ত্রীকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিয়েবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার তৈরির আয়োজন চলছে। এতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি অসচ্ছল পরিবারের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান। গায়েহলুদ থেকে শুরু করে বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতাই ছিলো উৎসবমুখর।
জুমার নামাজের পর কনের বাড়িতে আসেন বর কাউছার ও তার স্বজনেরা। রুহুল আমিন বরকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।
কনের মা বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরে রুহুল আমিন বিয়ের সব দায়িত্ব নেন এবং নিজের মেয়ের মতো করে আয়োজন সম্পন্ন করেন। এতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে মেয়ের বিয়ে দিতে পারবেন, তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলো না।
নবদম্পতি রুহুল আমিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান। কাউছার বলেন, কনের বাড়ির আতিথেয়তা ও বিয়ের আয়োজন তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
নিজের উদ্যোগে আয়োজন করা প্রতিটি বিয়ের তারিখ ও স্থান লিখে রাখেন পেশায় ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ব্যবসায়ী রুহুল আমিন। অনেক বিয়ের ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করেছেন তিনি। অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করা তার শখে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক মেয়ের বাবা।
নিজের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ বছরে ১১৩ জন মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল।
এর আগে গত ২১ আগস্ট শুক্রবার সন্ধ্যায় ১১২তম মেয়ের বিয়ে দেন তিনি। সুমাইয়া আক্তার নামের ওই তরুণী রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের মৃত সামছুল আলমের মেয়ে। এতিম সুমাইয়ার বিয়েরও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেন রুহুল আমিন।
সুমাইয়ার মা জহুরা বেওয়া গণমাধ্যমকে বলেন, হামার বিটিডাক ব্যা দেওয়া শ্যাষ করলাম। একন সত্যিই মাথার ওপর তেনে একটা ভারী বুজাক নাইম্যা গ্যালো বাপু! বাপ-ছাঁড়া ই এতিম বিটিডাক যে এইরাম ঘটা ঘটাইয়া বিয়া দিতে পারবো, স্যাডা জীবনেও ভাবি নাই। একজনা ভালো মানুষ আইস্যা এমন ধারার হাত বাড়ায় দিল বলেই ইজ্জতের সাথে বিটিডার বিয়াডাক পার করতে পারলাম।
তিনি বলেন, মেয়ে ছোট থাকতেই স্বামী মারা যান। এরপর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে শুরু হয় আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। মাঠে-ঘাটে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছি, লেখাপড়া শিখিয়েছি। তবে মেয়ের বিয়ে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। রুহুল আমিনের সহায়তায় সেই দুশ্চিন্তা আমর দূর হয়।
গত ২১ জুন রুহুল আমিনের উদ্যোগে ১০৯তম বিয়ের আয়োজন করা হয় নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতি গ্রামের জালাল মোল্লার মেয়ে রাবেয়া খাতুনের। রাবেয়া বলেন, আট বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমার বাবা মারা যান। এরপর থেকে আমার বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল পরিবার। পরে রুহুল আমিনের সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে আমার বিয়ে হয়। এ জন্য রুহুল আমিনের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসী রুহুল আমিনের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নিজের অর্থে এমন আয়োজন করা নিঃসন্দেহে মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।
ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম বলেন, রুহুল আমিন ওয়ালিয়া বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তিনি মাঝেমধ্যে অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেন এবং পুরো খরচ বহন করেন। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
বড়াইগ্রামের ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অসহায় পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে রুহুল আমিনের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তার এই মানবিক কর্মকাণ্ড সমাজের অন্য বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।
রুহুল আমিন বলেন, এই পৃথিবীতে অনেকের অনেক রকম শখ রয়েছে। আমি আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজের হতদরিদ্র মেয়েদের বিয়ে সম্পন্ন করে দিতে চাই। এটাই আমার শখ। এর বিনিময়ে এ জীবনে কিছুই চাই না। সৃষ্টিকর্তা পরকালে আমাকে নিশ্চয়ই প্রতিদান দেবেন। আমি এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়েকে বিয়ে দিলাম। আমি মনে করি, আমি ১১৩ জন মেয়ের বাবা। ওরা আমার মেয়ে-জামাই।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category