• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৭:২০ অপরাহ্ন

ইরানের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতক’ যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি মানবে না ইসরায়েল

Reporter Name / ৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

প্রভাত ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান গত রোববার গভীর রাতে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার পরদিন গতকাল সোমবার সকালে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে ঘোষণা করেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি সই হয়েছে।’ গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, এ চুক্তিতে লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।
এ–সংক্রান্ত আলোচনায় সহযোগিতা করার জন্য ইসরায়েলের চিরবৈরী দেশ তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে।
পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি ‘সম্পূর্ণ’ হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিভাবাদি জানান, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এ চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না।
নেতানিয়াহুর এ বক্তব্যের সুর ধরে গতকাল ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে।
কাৎজ আরও বলেন, ইসরায়েলের দখলে থাকা এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হবে। ওই এলাকার বেসামরিক বাড়িঘরগুলো ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
চুক্তিটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেছেন চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। স্মোট্রিচ লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এ চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে।
সম্প্রতি লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে বৈরুতের ভবনগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন স্মোট্রিচ। এখন এই চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও লেবাননে সেনাবাহিনীকে ‘পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করার’ অনুমতি দেওয়া অব্যাহত রাখবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীন রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’ এই উগ্রপন্থী মন্ত্রী আরও দাবি করেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে না। ইসরায়েল কোনো ‘বানানা রিপাবলিক (দুর্বল বা পুতুল রাষ্ট্র) নয় উল্লেখ করে বেন গভির বলেন, ‘এ চুক্তি আমাদের কোনোভাবেই বেঁধে রাখতে পারে না।’
ইসরায়েল সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাও চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইরানে হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহর ওয়াইনেটকে বলেন, তাঁদের সরকার শুধু একটি বিষয়েই আগ্রহী—ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, কি নেই।
জোহর দাবি করেন, ‘ইসরায়েল যদি দেখে যে তার নিরাপত্তা বিপন্ন, তবে সে ইরানের ওপর তীব্র আঘাত হানবে।’ তিনি আরও বলেন, এ আঘাতের ফলে ইরানিরা ‘শুধু হাঁটু গেড়েই বসবেন না, বরং তাঁদের মাথাও নত করতে হবে।’
ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও, বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১৪ নিউজ’-এর সাংবাদিক ইনন মাগাল, যাঁকে ইসরায়েলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে আখ্যা দেন।
ইনন মাগাল মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইঙ্গিত করে একটি সাধারণ ইহুদিবিদ্বেষী গালি ব্যবহার করে ‘লিটল জিউস’ (ছোট ইহুদি) বলে উল্লেখ করেন।
একই টেলিভিশন চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন গতকাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের যে নিজস্ব স্বার্থ আছে, তা এই ‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’কে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।
ইসরায়েলের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইসরায়েল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ফোরাম’ (আইডিএসএফ) গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইরানের “সন্ত্রাসী” সরকারের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং বর্তমান চুক্তিটির পরিণতিও ভিন্ন কিছু হবে না।’
আইডিএসএফ আরও বলেছে, ‘এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর, সামনে কী আসছে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার এবং লেবানন ও ইরান থেকে হুমকি দূর করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করার উপযুক্ত সময়।’অন্যদিকে অনেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও চড়াও হয়েছেন। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই সুযোগে তাঁর নেতৃত্ব ও যুদ্ধনীতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন।
মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।
গোলানের মতে, এ নতুন চুক্তি ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বহু বছরের ভুল নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন। এর ফলে ইসরায়েল এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট বলেন, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগের কোনো সমাধান করতে পারেনি। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের ‘মহাবিপর্যয়ের’ (ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলা) পর গত প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ (গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন) একটি ব্যর্থ সরকারের নির্মম ফলাফল বয়ে এনেছে।
ইসরায়েলের মধ্য-বামপন্থী দল ‘দ্য ডেমোক্র্যাটস’-এর নেতা ইয়ার গোলান নেতানিয়াহুকে ‘দুর্বল, অসুস্থ, জনবিচ্ছিন্ন ও প্রভাবহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যা ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বহাল রেখেই দেশটির শত কোটি ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ তাদের হাতে ফিরিয়ে দেবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘এ সরকার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম এবং আমাদের একটি ক্ষয়িষ্ণু ও স্থবির যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ বেনেট আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়ার এবং তাঁর ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাত করার জন্য তাঁর কাছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category