প্রভাত সংবাদদাতা, রাঙ্গামাটি: পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটির বাজারে মৌসুমের শেষ সময়ে এসেও আমে বাজার ভরপুর হয়ে আছে। এ বছর আমের ফলন ভালো হওয়াতে দামেও সস্তা পেয়েছেন ক্রেতারা। জেলা শহর ছাড়াও উপজেলাগুলোতে মিলছে পাহাড়ের মাটিতে উৎপাদিত আম্রপালি, রাংগুই, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, বারি-৪, হাড়িভাঙ্গা ও কাটিমনের। শহরের তুলনায় উপজেলার বাজারগুলোতে আরও কম দামে মিলছে এসব আম।
রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় তিন হাজার ৬২৫ হেক্টর ভূমিতে ৩৮ হাজার ২৮৫ টন আম উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ৬৩৫ হেক্টরে। পাহাড়ের ঢাল ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলায় এখন দেশীয় জাতের পাশাপাশি রাংগুই (মিয়ানমারের জাত), আম্রপালি (ভারতের জাত), বারি আম-৪, মিয়াজাকি, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ব্রুনাই কিং ও কাটিমনের মতো বিশ্বখ্যাত ও দামি বিদেশি জাতের আমের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু আম্রপালি বাজারের শেষভাগে আসায় এর চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি।
রাঙ্গামাটি শহরের বনরুপা বাজারের মৌসুমি ফল বিক্রেতা কাঞ্চন চাকমা বলেন, ‘এ বছর ফলন ভালো হওয়াতে সস্তায় বিক্রি করছি আম্রপালি ও রাংগুই জাতের আম। তিন কেজি আম মাত্র ১শ টাকায় পাবেন আমার কাছে। তবে কেউ যদি বেশি নেয় তখন আরও কিছু কমেও দিয়ে দেবো। গত চার বছর যাবৎ বিভিন্ন বাজারে মৌসুমি ফলের ব্যবসা করি। এ বছর আম সব চাইতে সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে।’
বনরুপা বাজারের পুরানো ফল ব্যবসায়ী বিন্দু মজুমদার বলেন, বাজারের সেরা আম পাবেন। এখানে বসে ব্যবসা করি। কোনো আম খারাপ হলে ফেরতও দিতে পারবেন। তবে আমার দোকানে আমের দাম তুলনামূলক বেশি। বাজারের বাছাই করা ভালো আমটাই বিক্রি করি। এখন আম্রপালি ৬০ টাকা, বারি ফোর ৬০ টাকা, হাড়িভাঙ্গা ৬০ টাকা ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১০০ টাকা কেজিতে পাবেন।
আরেক খুচরা আম বিক্রেতা দয়ালাল চাকমা শুধু ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে বাজারের ফুটপাতে বসেছেন বিক্রি করতে। তিনি বলেন, ‘এই জাতের আম এখন প্রচুর চাষ হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমেছে ব্যানানা আমের দাম। আগামী বছর হয়ত আরো কমে যাবে। বর্তমানে মাত্র ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি ব্যানানা ম্যাঙ্গো।’
শহরের বনরুপা বাজারের সমতা ঘাট এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই মৌসুমি ফলের হাট বসে। এই হাট থেকে স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ছাড়াও পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফল কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফলের আড়তে নিয়ে যান।
সমতা ঘাটের পাইকারি ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিন বাবলু বলেন, ‘পাহাড়ে আমের উৎপাদন বেশি হওয়াতে এ বছর দাম অনেক কম। বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ব্যবসা করি এবং এই বাজার থেকেই ফল কিনে আড়তে নিয়ে বিক্রি করি। বর্তমানে এ বাজারে হাড়িভাঙ্গা আম প্রতি মণ এক হাজার থেকে এক হাজার ৬ শ টাকা, আম্রপালি এক হাজার থেকে এক হাজার ৪শ টাকা এবং রাংগুই ৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে আমের দাম নিয়ে চাষি পর্যায়ে হতাশা বিরাজ করছে। চাষিরা বলছেন, বাগান করা এবং ফলন উৎপাদনে ব্যয় অনেক বেশি। সাথে পরিবহন খরচ যুক্ত করলে ক্ষতি ছাড়া লাভের মুখ দেখা যায় না। অন্যান্য জাতের আমের সাথে পাহাড়ের মাটিতে ভালো ফলন হয় রাংগুই জাতের আম। এই আম বর্তমানে পাইকারি মাত্র ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচই উঠছে না।
লংগদু উপজেলার কৃষক সাধন বিকাশ চাকমা বলেন, ‘দুই একর জমির বিশাল আম বাগানটি বিক্রি করেছি মাত্র এক লক্ষ টাকায়। বাজারে দাম নেই বলে পাইকার এখনো আম গাছ থেকে পাড়ছে না। সিজনের শেষে কিছুটা দাম বাড়তে পারে। তখন তারা আম সংগ্রহ শুরু করবে। আরো অনেক চাষি আম চাষে নেমেছেন। কিন্তু দাম না পেলে কৃষকের তো লোকসান গুণতে হবে।’
লংগদুর সব চাইতে বড় আম বাগানের মালিক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুর রহিম এর ছেলে ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি জমিতে আম্রপালি, মল্লিকা, খীরসাপাত ও রাংগুই জাতের আমের চাষ করেছি। ১৫ বছর বয়সি এই বাগান থেকে আগে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় হতো। এ বছর দাম কমে সাত লাখে ঠেকেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাগানের পেছনে যে পরিমাণ খরচ করেছি, তাতে দিনশেষে খুব একটা লাভবান হতে পারিনি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদ-সংলগ্ন দুর্গম বাগানগুলো থেকে আম পরিবহনে খরচ অনেক বেশি পড়ে। এছাড়া ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহারে আম পোকা ও ছত্রাকমুক্ত থাকে, কিন্তু প্রতিটি ব্যাগের দাম তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা হওয়ায় ক্ষুদ্র চাষীরা অর্থাভাবে এটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে আমের উৎপাদন বেশি হলেও কোয়ালিটিতে ভালো করতে পারছেনা কৃষক। তাই বাজারে তুলনামূলক দাম অনেকটা কম।’