• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:২৩ অপরাহ্ন
তদন্তের আহ্বান বিসিবির

জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈমকে মারধর , এসআইসহ তিনজন প্রত্যাহার

Reporter Name / ৪১ Time View
Update : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

প্রভাত স্পোর্টস: বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে তাঁকে খুলশী থানায় নিয়ে গিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ নাঈমের। এ ঘটনায় পুলিশের এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিনজনকে নগরের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ক্রিকেটার নাঈম হাসান রাতে সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রাম আসার কথা ছিল তাঁর। তবে বিলম্ব হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌঁছান। এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশা করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশের এক সদস্য থামার সংকেত দেন।
নাঈম হাসান বলেন, থামাতেই কয়েকজন ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেন। এরপর তাঁকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাঁকে ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম হাতে থাকা লাঠি দিয়ে কোমরে আঘাত করতে থাকেন।
পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা (পুলিশের সোর্স সোহেল) এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে পেটান বলে জানান নাঈম হাসান।
মারধরের সময় ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হয়ে যায় জানিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, ‘প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমার ক্রিকেটার পরিচয় দিলেও তারা মারধর থামায়নি। তারা বলছিল—তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’
মারধরের একপর্যায়ে আরেকটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। তিনি বলেন, পুলিশের গাড়ি থাকলেও সেখানে তাঁকে তোলা হয়নি। মারধরের একপর্যায়ে তাঁকে থানায় নিয়ে যান এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয় তাঁকে। ওসির কক্ষেও তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানান নাঈম। তিনি বলেন, ওসিকে তিনি যখন ঘটনার বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন তখন ওসি বারবার বলেন চোখ নিচু করে কথা বলতে। এর মধ্যেই একটি ফোন পেয়ে ওসি শান্ত হন।
নাঈম হাসান আরও বলেন, ‘অটোরিকশা থেকে নামানোর পর আমার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। থানায় আসার পর ফোনটি পেয়ে আমি বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করি। তিনি বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে বিষয়টি জানান। এরপর তাঁরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। আজকে আমার সঙ্গে হয়েছে। আমার জন্য অনেক লোক এসেছে থানায়। কিন্তু অন্য সাধারণ লোকের জন্য কেউ থানায় আসবে না। আর কাউকে যাতে এভাবে হয়রানির শিকার হতে না হয়।’
এ ব্যাপারে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘চোরাচালানের তথ্য ছিল অটোরিকশাটির বিরুদ্ধে। তবে এই তথ্য কতটুকু সঠিক যাচাই করা হচ্ছে। আর অভিযান চালানোর আগে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়েছে কি না তা–ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযান কিংবা তল্লাশিতে পুলিশের কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।’
পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘অভিযান চালানোর নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে এখানে ভুলত্রুটি রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় রয়েছেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনিরুল ইসলাম। তিনি এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সোনার চোরাচালান আসবে। এই তথ্যের ভিত্তিতে শফিকুল লালখান বাজার এলাকায় অভিযানে যান। মনিরুল একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে চোরাচালানের এই তথ্য পেয়েছেন দাবি করেছেন।
নাঈমকে পুলিশের মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে রাতে থানায় ছুটে যান তাঁর বাবা মাহবুবুল আলম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিমানবন্দর থেকে নামার পর নাঈমের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। পরে নাঈম পুলিশের মারধর করার খবর জানায়।
নাঈমের বাবা অভিযোগ করেন, ‘খবর পেয়ে থানায় এলে ডিউটি অফিসার আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
মধ্যরাতে নাঈমকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে হাজির হন তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরাও। ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করেন তাঁরা। শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশ সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
জানতে চাইলে খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, ‘অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল ইসলাম আমাকে কিছু জানাননি। থানায় নিয়ে আসার পর ক্রিকেটার নাঈমের পরিচয় জানি। দুঃখ প্রকাশ করে সসম্মানে থানা থেকে তাঁকে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তবে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা থানা থেকে যাবেন না জানান। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।’ ওসি বলেন, ‘এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও অভিযানে থাকা আরেক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিক ক্লোজ করা হয়েছে।’
তদন্তের আহ্বান বিসিবির: শুক্রবার রাতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন জাতীয় দলের স্পিনার নাঈম ইসলাম। সেখানে বাসায় ফেরার পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব। শনিবার সকালে এক বিবৃতিতে বিসিবি জানিয়েছে, নাঈম হাসানকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কয়েকজন সদস্য কর্তৃক হেনস্তা ও লাঞ্ছিত করার ঘটনায় সংস্থাটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশোভন এই আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বোর্ড পুরো বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছে।
এ ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিসিবি।
বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিষয়টি জানার পর থেকে নাঈম হাসান ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে, যাতে তাঁদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি এই গুরুতর সমস্যার একটি সুষ্ঠু সমাধানের লক্ষ্যে বোর্ড চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এর আগে আলাদা বিবৃতিতে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব নাঈমের ওপর পুলিশের শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানির তীব্র নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘আমরা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নাঈম হাসানের ওপর শারীরিক নির্যাতনে জড়িত প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
কোয়াবের বিবৃতিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, সাভারের বিকেএসপিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ শেষে চট্টগ্রামের বাড়িতে ফেরার পথে লালখান বাজারের কাছে পুলিশ নাঈমকে থামায়। শুরু থেকেই পুলিশ বৈরী আচরণ করে এবং নাঈম কথা বলার চেষ্টা করলে তাঁর গলা চেপে ধরে। জাতীয় ক্রিকেটার নাঈম হাসান বলে পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও তাঁকে পাইপ দিয়ে পেটানো হয়। এরপর নাঈমকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও তাঁর সঙ্গে আরও দুর্ব্যবহার করা হয়।
এ বিষয়ে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, এ ঘটনায় পুলিশের এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিনজনকে নগরের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category