নুরুল ইসলাম সুমন, কক্সবাজার : বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারকে ঘিরে শুরু হয়েছে বড় ধরনের রূপান্তরের প্রস্তুতি। পর্যটননির্ভর এই শহরকে শুধু দেশি পর্যটকদের গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া হচ্ছে সমন্বিত ‘কক্সবাজার মেগা মাস্টারপ্ল্যান’।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যেই এই মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের নগর ব্যবস্থাপনা, পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও নাগরিক সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজারের অর্থনীতি মূলত পর্যটননির্ভর। কিন্তু পর্যটনকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, গবেষণা ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে শহরটির অর্থনৈতিক পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনায় কক্সবাজারকে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘গ্রোথ হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। পর্যটন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি পর্যটক ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাও এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মেগা মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বনাঞ্চল ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যকে বিবেচনায় রেখে নির্দিষ্ট এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের ইকো-রিসোর্ট, আধুনিক হোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের শৈবাল ও লাবণী বিচ এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশ্বমানের পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। তবে পরিবেশবিদদের মতে, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কক্সবাজারের পর্যটন উন্নয়নে দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয় উপকূলীয় এলাকায় নির্মাণ ও উন্নয়নসংক্রান্ত বিধিনিষেধ।
স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যমান ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় পরিবেশ ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রেখে বিধিনিষেধকে বাস্তবসম্মত করা গেলে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে। তবে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় না নিয়ে বিধিনিষেধ শিথিল করা হলে উল্টো কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
মেগা মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় কক্সবাজারকে আধুনিক ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটকদের দীর্ঘ সময় কক্সবাজারে অবস্থান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও পর্যটন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পানি শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে এসটিপি ও ডব্লিউটিপি ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে পর্যটন মৌসুমে বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন ও সমুদ্রের দিকে রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পকে ভবিষ্যৎ পর্যটন বিকাশের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় পর্যটকদের যাতায়াতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বিমান ও রেল যোগাযোগকে মেগা মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বিত করা হলে কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কক্সবাজার শহরের বাইরেও পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ, ইনানী, পাটুয়ারটেক, টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
সমুদ্রের পাশাপাশি পাহাড়, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলা গেলে পর্যটকদের অবস্থানের সময় যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।
টেকনাফের বনাঞ্চলে বিভিন্ন বিরল বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী ও বনাঞ্চল সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
উন্নয়নের পাশাপাশি কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত রক্ষা করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৈকতের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল এবং অন্যান্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, দখল ও দূষণ রোধ এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদারের দাবি রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। তাই সেই প্রকৃতি ধ্বংস করে যদি পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পর্যটনের পাশাপাশি কক্সবাজারকে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কক্সবাজারে দেশের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উচ্চগতির ইন্টারনেট অবকাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। এতে তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মেগা মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কক্সবাজারের স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পর্যটন মৌসুমের অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলায় একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান অত্যন্ত জরুরি।
তবে উন্নয়নের সুফল যেন শুধু বড় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—স্থানীয় জনগণও যেন কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও নাগরিক সুবিধার মাধ্যমে এর সুফল পায়, সেটি নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে পরিকল্পিত ও সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনাই মূল লক্ষ্য। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সুবিধা—সবকিছুকে সমন্বয় করেই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, মেগা মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হলে কক্সবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পর্যটন ও বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
কক্সবাজারের পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, মেগা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের যোগাযোগ, নিরাপত্তা, আবাসন, বিনোদন, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শুধু দেশীয় নয়, বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটকও কক্সবাজারে আকৃষ্ট করা সম্ভব।
তবে তারা চান, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হোক এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হোক।
সব মিলিয়ে কক্সবাজার এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। মেগা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রসৈকতনির্ভর পর্যটন নগরী থেকে কক্সবাজার একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রে রূপ নিতে পারে। তবে পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বড় প্রকল্প গ্রহণের ওপর নয়; বরং সঠিক বাস্তবায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, স্বচ্ছতা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, অবকাঠামোর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
২০২৬ সালে মেগা মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হওয়ার পর কক্সবাজারের সামনে খুলতে পারে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়—এই মহাপরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, কতটা পরিবেশবান্ধব এবং এর সুফল শেষ পর্যন্ত কতটা পৌঁছায় কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের ঘরে।