• রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৬ অপরাহ্ন
Headline
ইসরায়েলে সমন্বিত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে কী আলোচনা হলো ট্রাম্পের দূতদের হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পিছু হটবে না ইরান মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মিসরের জনপ্রিয় নারী টিভি উপস্থাপকসহ ১২ জনের ফাঁসির আদেশ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের পর বন্ধ ইন্দোনেশিয়ার প্রধান বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ওমান উপসাগরে ডুবে গেলো ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজসহ ছয় জাহাজে হামলা বিপ্লবী গার্ডের এনবিআর আন্দোলনে শাস্তি পাওয়া ২০ কর্মকর্তার দণ্ড মওকুফ গাবতলী-দাশেরকান্দি রুটের মেট্রো প্রকল্প উঠছে একনেকে ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কমাতে বন্ড পুনঃক্রয় কার্যক্রম চালুর পরামর্শ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের

গ্যাস সংকটে সিরামিক শিল্পে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, রপ্তানি কমছে, বিঘ্নিত সরবরাহ

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রভাত অর্থনীতি: বিসিএমইএর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে টেবিলওয়্যার, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও সিরামিক ইট তৈরির মোট ৭৬টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টিই টাইলস কারখানা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় টাইলসের বাজারের আকার ছিল ৫ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। এর ৮২ শতাংশই দেশীয় উৎপাদকদের দখলে ছিল। একই অর্থবছরে পুরো সিরামিক খাতের সার্বিক বাজারের আকার দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। এ খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষের। সিরামিক কারখানাগুলো মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ভোলায় অবস্থিত।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ভোলা ও হবিগঞ্জের তুলনামূলক ভালো গ্যাস সরবরাহ থাকা সাত-আটটি কারখানা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রায় সব কারখানাই এখন গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে।
সংকটকবলিত শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার সাভার ও ধামরাই; নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও মেঘনাঘাট; গাজীপুরের কাশিমপুর, ভবানীপুর, ভাওয়াল মির্জাপুর, শ্রীপুর ও মাওনা; নরসিংদীর পাঁচদোনা; ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল এবং হবিগঞ্জের মাধবপুর ও বাহুবল। এ শিল্পের শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর বেশিরভাগই এখন মাত্র ২০–৩০ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে চলছে।
দেশের দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে সিরামিক শিল্প এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। সংকটের জেরে কিছু কারখানা উৎপাদন লাইন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে, আবার অনেক কারখানা চলছে অর্ধেকেরও কম সক্ষমতায়।
এ খাতে নেতারা জানিয়েছেন, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, নরসিংদী, ময়মনসিংহ ও হবিগঞ্জসহ দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোর ৩০টিরও বেশি সিরামিক, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার কারখানা তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছে।
তারা জানান, সিরামিক কারখানা চালু রাখতে সাধারণত প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১৫ পাউন্ড (পিএসআই) গ্যাস চাপের প্রয়োজন হয়। তবে গত এক মাসের বেশিরভাগ সময়ই এই চাপ কমে ৩–৪ পিএসআইতে নেমে এসেছে, অনেক সময় তা শূন্যেও নেমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক কারখানা মাত্র ৩৪–৪০ শতাংশ সক্ষমতায় কার্যক্রম চালাচ্ছে।
সিরামিক খাতের সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, রপ্তানি কমছে, বিঘ্নিত হচ্ছে স্থানীয় সরবরাহ। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারাও ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন কিংবা কমিয়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন বলেন, ‘পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে কারখানাগুলো তীব্র আর্থিক সংকটে পড়বে। এছাড়া স্থানীয় উৎপাদন কমে গেলে পণ্য আমদানির পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে।’
বিসিএমইএর তথ্যমতে, সিরামিক পণ্যের মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ১২ শতাংশই যায় গ্যাসের পেছনে। সিরামিক তৈরির চুল্লিতে টানা প্রায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। হঠাৎ গ্যাসের চাপ কমে গেলে চুল্লির ভেতরে থাকা পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
তাছাড়া একবার কোনো চুল্লি বন্ধ হয়ে গেলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর তা ফের চালু করতে আরও ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা লেগে যায়। ফলে গ্যাসের এই অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদনকারীদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিঘ্নের কারণে কারখানাগুলোর পক্ষে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা মাফিক পণ্য সরবরাহ করা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে টেবিলওয়্যার রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান আর্টিসান সিরামিকসের উৎপাদনও গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
গাজীপুরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় প্রতিদিন সাত টন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন চালু রাখতে শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে তারা পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়েছে। তবে ঘন ঘন লোডশেডিং নতুন সমস্যার সৃষ্টি করছে।
আর্টিসান সিরামিকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ ৩৫–৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানিও প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ কমে গেছে। বাধ্য হয়ে আমাদের অর্ডার নেওয়ার পরিমাণও কমাতে হয়েছে। এতে ক্রেতারা হতাশ হচ্ছেন। আগামী বছর তারা আমাদের ক্রয়াদেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গ্রেট ওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের টাইলস কারখানা এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানার বেশিরভাগ শ্রমিককে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
হবিগঞ্জে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির স্যানিটারিওয়্যার কারখানায় সাধারণত মাসে প্রায় ১ লাখ কমোড, বেসিন ও অন্যান্য স্যানিটারি পণ্য উৎপাদিত হয়। তবে সেখানেও উৎপাদন প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।
গ্রেট ওয়ালের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত তাদের এক-দেড় মাসের বিক্রির সমপরিমাণ টাইলস মজুত রাখে। তিনি বলেন, ‘গ্যাস সংকটে প্রায় এক মাস ধরে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আমরা বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছি না, বিক্রিও ইতিমধ্যে কমে গেছে। আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
শীর্ষস্থানীয় সিরামিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকস গ্যাস সংকটের কারণে চারটি উৎপাদন ইউনিটই টানা আট দিন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। গত শুক্রবার একটি ইউনিট ফের চালু হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এখন ২৫ শতাংশ সক্ষমতার নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
আরএকে সিরামিকসের সিইও মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, কারখানা বন্ধ থাকার কারণে তাদের ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনও করা হয়নি।
এই বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত মীর সিরামিকসের ওপরেও। তাদের চারটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে তিনটিই ১৭ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও তা কমে মাত্র ৫০ হাজার বর্গফুটে নেমে এসেছে। কারখানার ৮০০ শ্রমিকের বেশিরভাগই এখন ছুটিতে আছেন। মীর সিরামিকসের একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান গ্যাসের যে চাপ রয়েছে, তা দিয়ে কেবল একটি ইউনিট চালানো সম্ভব।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আষাড়িয়ারচরে অবস্থিত মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সিরামিক কারখানাও গ্যাসের সরবরাহ সংকটে ভুগছে।
মেঘনা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) একেএম জিয়াউল ইসলাম জানান, কারখানাটির দৈনিক ৫১ হাজার বর্গমিটার টাইলস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং তারা বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
বিসিএমইএ সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ভোলা ও হবিগঞ্জের বাইরের কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
তিনি জানান, গ্যাস সংকট নিরসনে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ চেম্বার অভ ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) প্রতিনিধিরা সম্প্রতি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘যে খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, সেখানে উৎপাদনকারীরা এখন আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘায়িত এই গ্যাস সংকট সাময়িক উৎপাদন বিপর্যয়কে আরও গভীর শিল্প ও কর্মসংস্থান সংকটে রূপ দিতে পারে।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category