প্রভাত সংবাদদাতা, ফেনী: সড়ক আছে, যানবাহনও চলছে কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পোহাতে হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। কারণ কোথাও রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং, আবার কোথাও সড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং নির্ধারিত সময় উপেক্ষা করে শহরে দূরপাল্লার বাস ও মালবাহী যানবাহনের প্রবেশ। সব মিলিয়ে ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে ফেনী শহরের সড়কব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফেনী শহরে ২৫ হাজারের বেশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর বিপরীতে অনুমোদিত সিএনজির সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। পাশাপাশি শহরে চলাচল করছে নয় হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও টমটম। বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপ সামলানোর মতো সড়ক ও পার্কিং সুবিধা না থাকায় যানজট পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে।
শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কগুলোর অন্যতম শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক। সড়কটির দুই পাশে রয়েছে বিপণিবিতান, শোরুম, হাসপাতাল, আবাসিক হোটেল, ব্যাংক-বিমা ও সুপারশপ। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা না থাকায় ক্রেতা ও সেবাগ্রহীতাদের যানবাহন রাখতে হচ্ছে মূল সড়কের ওপর। এতে সড়কের ব্যবহারযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে যানজট তৈরি হচ্ছে।
একই পরিস্থিতি দেখা যায় ট্রাংক রোড, মিজান রোড, জেল রোড ও কলেজ রোডসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে। কোথাও রাস্তার পাশে যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে, কোথাও যাত্রী ওঠানামার জন্য সড়কের ওপরই থামছে অটোরিকশা। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা অবৈধ সিএনজি স্ট্যান্ড। স্থানীয়দের দাবি, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ের ১০টির বেশি স্থানে এ ধরনের স্ট্যান্ড রয়েছে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজটের কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না চাকরিজীবীরা। শিক্ষার্থীদেরও পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক এলাকার আশপাশে যানজটের কারণে সামান্য পথ অতিক্রম করতেও দীর্ঘ সময় লাগছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের মতে, ফেনী শহরে জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী সড়কের সক্ষমতা ও পার্কিং অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে সড়ককে একদিকে চলাচলের পথ, অন্যদিকে পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। যত্রতত্র থামা, হঠাৎ দিক পরিবর্তন এবং সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামার কারণে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দূরপাল্লার বাস ও বালুবাহীসহ পণ্যবাহী যানবাহন শহরে প্রবেশ করায় ব্যস্ত সড়কে বাড়ছে চাপ।
ফেনী ট্রাফিক বিভাগের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) শাহাদাত হোসেন বলেন, যানজট কমাতে অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তার পাশের পার্কিং বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। পার্কিং ব্যবস্থাপনা সঠিক না হলে সাধারণ যানবাহন রাখার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির উদ্দিন বলেন, নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে পার্কিং সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পার্কিং ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়েও পৌরসভার পদক্ষেপ রয়েছে।
নগরবাসীর মতে, ফেনীর যানজট নিরসনে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। এজন্য সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিং বন্ধ, অনুমোদনহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের শহরে প্রবেশের সময়সীমা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় পরিকল্পিত পার্কিং সুবিধা তৈরি, ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের উপযোগী রাখা এবং ট্রাফিক পুলিশ, পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একসময়ের শান্ত ফেনী শহরে এখন যানজট নিত্যদিনের বাস্তবতা। সড়ক দখল, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও অপর্যাপ্ত পার্কিংয়ের এই সংকট কাটাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।