প্রভাত সংবাদদাতা, বরিশাল: ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও বরিশালের নদ-নদীতে এখনও প্রত্যাশা অনুযায়ী ধরা পড়ছে না রূপালি এ মাছ। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের অনেকেই ইলিশ কেনার পরিবর্তে অন্য মাছের দিকে ঝুঁকছেন। রবিবার (১৯ জুলাই) সকালে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েকদিন ধরে ইলিশের আমদানি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে যেখানে প্রতিদিন হাজার মণ ইলিশ আসার কথা সেখানে মাত্র ১০০-১৫০ মণ মাছ উঠছে। এ সীমিত সরবরাহের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দামে।
পাইকারি বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। খুচরা বাজারে দাম আরও চড়া।
আড়তদারদের দাবি, এ সময়ে সাধারণত বাজারে ইলিশের জোগান অনেক বেশি থাকে। কিন্তু স্থানীয় নদীতে মাছের আকাল পড়েছে। প্রত্যাশিত সরবরাহ মিলছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো যাচ্ছে না।
পোর্ট রোড ইলিশ মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, নদীতে ইলিশে খুবই কম। গত কয়েকদিনে মোকামে ৬০ থেকে ১০০ মণের বেশি ইলিশ ওঠেনি। অথচ আগে কয়েকশ মণ মাছ পাওয়া স্বাভাবিক
মেসার্স দুলাল ফিশের ম্যানেজার মো. রবিন জানান, কয়েক বছর আগেও ভরা মৌসুমে পোর্ট রোডের আড়তগুলোতে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মণ ইলিশ বেচাকেনা হতো। এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে ১০০ মণের বেশি মাছই আসছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।
মহানগর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক-সমিতির সভাপতি মো. জহির শিকদার বলেন, আগে ১৭০ আড়তে প্রতিদিন এক হাজার থেকে ১২০০ মণ ইলিশ উঠতো। এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ মণে। আগে যেখানে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো, বর্তমানে তা ৩০-৪০ লাখ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দামের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারাও। সাইফুল নামের এক ক্রেতা বলেন, আগে যে ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় কেনা যেত, এখন একই ধরনের মাছ কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায়। তার অভিযোগ, সরবরাহ কম থাকার সুযোগে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়িয়ে রেখেছে।
আরেক ক্রেতা মামুন জানান, খুচরা বাজারের তুলনায় কিছুটা কম দামে মাছ কিনতে পাইকারি বাজারে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও দাম প্রায় একই। শেষ পর্যন্ত ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের চারটি ইলিশ কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
সোহেল নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ইলিশের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাঙ্গাশ কিনেছি। আগে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন সেই মাছের দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। একই সঙ্গে অন্যান্য মাছের দামও বেড়েছে। বর্তমানে পাঙ্গাশ কিনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ২৮০ টাকায়।
অন্যদিকে হতাশ সময় পার করছেন জেলেরা। কীর্তনখোলা নদীর জেলে আসলাম বলেন, নদীতে ছোট-বড় কোনো সাইজের ইলিশই মিলছে না। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে। এছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদীতে ঠিকমতো জাল ফেলাও যাচ্ছে না।
কীর্তনখোলা নদীর আরেক জেলে সগির জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে নদীতে গেলেও ইলিশের দেখা মিলছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ঋণ শোধ করতে জাল বিক্রি ছাড়া উপায় থাকবে না।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, জুন থেকে ইলিশের মৌসুম শুরু হলেও প্রকৃত ভরা মৌসুম সাধারণত জুলাই থেকে শুরু হয়। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে সাগর থেকে নদীতে ইলিশের আগমন বাড়বে। তখন ইলিশের দামও কমবে বলে তিনি আশাবাদী।