প্রভাত অর্থনীতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাংলাদেশে আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছিল ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেড (ঝাড়খন্ড) থেকে কেনা বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ বিভাগের আর্থিক বিবরণী এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম ভারতের অন্য তিনটি আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারীর সম্মিলিত গড় দামের তুলনায় প্রায় ৫৯ শতাংশ বেশি ছিল।
বাংলাদেশ পৃথক চুক্তির আওতায় ভারতের চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে। এগুলো হলো—আদানি পাওয়ার, এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যবসা নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন), সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়া লিমিটেড এবং পাওয়ার ট্রেডিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (পিটিসি ইন্ডিয়া)।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদানি থেকে আমদানি করা প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) গড়ে ১৪ দশমিক ৮৬ টাকা পরিশোধ করেছে। অন্যদিকে, বাকি তিন সরবরাহকারীর বিদ্যুতের সম্মিলিত গড় দাম ছিল ইউনিটপ্রতি ৯ দশমিক ৩৩ টাকা। প্রত্যেক সরবরাহকারীর সঙ্গে আলাদাভাবে তুলনা করলে দামের ব্যবধান আরও বেশি দাঁড়ায়।
আদানির বিদ্যুতের দাম এনভিভিএনের প্রতি ইউনিট ৭ দশমিক ৫৮ টাকার তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ বেশি ছিল। একইভাবে, পিটিসি ইন্ডিয়ার ১০ দশমিক ২০ টাকার তুলনায় তা প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং সেম্বকর্পের ১০ দশমিক ২২ টাকার তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট দাম ছিল ৮ দশমিক ৩৫ টাকা; এর তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ৭৮ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবি দেশীয় ও আমদানি—সব উৎস মিলিয়ে ১ লাখ ১ হাজার ১৮৭ দশমিক ১৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ কিনেছে। এতে মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় ক্রয়মূল্য প্রতি ইউনিট ১২ দশমিক ১০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১১ দশমিক ৩৫ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে প্রতি ইউনিটে গড় ব্যয় বেড়েছে ৭৫ পয়সা। বর্তমানে ভারত থেকে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট এবং নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঝাড়খন্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে ৮,০৩০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এ বাবদ গড়ে প্রতি ইউনিট ১৪ দশমিক ৮৬ টাকা হিসেবে মোট ১১,৯৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর আগের অর্থবছর (২০২৩-২৪) বাংলাদেশ একই উৎস থেকে ৮,১৭০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করে। সে সময় প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ১৪ দশমিক ৮৭ টাকা এবং মোট পরিশোধ করা হয় ১২,১৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ তিনটি পৃথক আন্তঃসীমান্ত করিডরের মাধ্যমে এনভিভিএন থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার করিডর দিয়ে ১,৮৪০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এ বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪২ টাকা, যা সব আমদানি রুটের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ত্রিপুরার ১৬০ মেগাওয়াট করিডর দিয়ে ৪৭৭ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসে, যার গড় মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট ১০ দশমিক ৬৪ টাকা। অন্যদিকে, ৩০০ মেগাওয়াট করিডর দিয়ে ২,৫২০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, এখানে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ৮ দশমিক ৪৬ টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই তিন করিডরে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট গড় মূল্য ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ১৮ টাকা, ৯ দশমিক ১৭ টাকা এবং ৮ দশমিক ০৮ টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনভিভিএন থেকে মোট ৪,৮৪০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এতে ব্যয় হয়েছে ৩,৪৫৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৭ দশমিক ১৪ টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৬ দশমিক ৮৬ টাকার তুলনায় ৪ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি।
তবে গ্রিড করপোরেশনকে সঞ্চালন বা হুইলিং চার্জ আলাদাভাবে পরিশোধ করায় ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা যোগ হওয়ার পর এনভিভিএনের বিদ্যুতের গড় মূল্য বেড়ে প্রতি ইউনিট ৭ দশমিক ৫৮ টাকায় দাঁড়ায়।
হুইলিং চার্জ অন্তর্ভুক্ত করার পরও এনভিভিএনের তিন রুটের মধ্যে ত্রিপুরা করিডরের বিদ্যুৎই সবচেয়ে ব্যয়বহুল ছিল। এ রুটে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ১০ দশমিক ৬৪ টাকা।
একই অর্থবছরে পিটিসি ইন্ডিয়া থেকে ১,৬২০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ। এ বাবদ পরিশোধ করা হয় ১,৬৫১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ফলে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২০ টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৯ দশমিক ২৯ টাকার তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। পিটিসির সঙ্গে করা চুক্তির মূল্যের মধ্যেই সঞ্চালন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেম্বকর্প বাংলাদেশে ১,৯২০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এ বাবদ প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে ১,৯৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ছিল ১০ দশমিক ২২ টাকা, যা আগের অর্থবছরের ১০ দশমিক ৪৩ টাকার তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম।
এনভিভিএনের বিপরীতে সেম্বকর্পের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে হুইলিং চার্জ আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৫ সালে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেপাল থেকে ১৫ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৩ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৫ টাকা।
বিভিন্ন করিডর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের জন্য দেশটির গ্রিড করপোরেশনকে আলাদাভাবে সঞ্চালন বা হুইলিং চার্জ পরিশোধ করে বাংলাদেশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রিড করপোরেশন ৪,৮৪০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে বাংলাদেশের কাছ থেকে ২১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা আদায় করেছে। আগের অর্থবছরে ৫,১৩০ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিপরীতে এ ব্যয় ছিল ২৭০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় সঞ্চালন ব্যয় ১৭ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ৫২ দশমিক ৭ পয়সা থেকে ৪৩ দশমিক ৭ পয়সায় নেমেছে। একই সময়ে মোট সঞ্চালন ব্যয় কমেছে ২১ দশমিক ৭২ শতাংশ। অথচ এনভিভিএনের করিডরগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ আমদানি কমেছে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তিনটি রুটের মধ্যে ২৫০ মেগাওয়াট করিডরে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন ব্যয় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, আমদানি অনেক কমে যাওয়ায় ১৬০ মেগাওয়াটের ত্রিপুরা করিডরে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে ৩০০ মেগাওয়াট করিডরে সবচেয়ে বেশি সাশ্রয় হয়েছে; এ রুটে প্রতি ইউনিট সঞ্চালন ব্যয় কমেছে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ।