• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
টাঙ্গাইলের নবাগত জেলা প্রশাসকের সাথে সাংবাদিকদের সৌজন্য সাক্ষাৎ হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের পর যান চলাচল স্বাভাবিক বিগ ব্যাশে মেলবোর্ন রেনেগেডসের জার্সিতে মাঠে নামবেন মুস্তাফিজ জানুয়ারিতে বাংলাদেশে আসছে ভারত, সম্ভাবনা ‘শতভাগ’ নেপাল প্রিমিয়ার লিগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন ১০ ক্রিকেটার চ্যাম্পিয়নস লিগে এমবাপের রেকর্ড ভাঙলেন ইয়ামাল নিলামে উঠছে মেসিদের সেই বিশ্বকাপ ট্রফি শীর্ষস্থানের কোনো মানে নেই, চ্যাম্পিয়ন হবে শুধু একটি দল : পিএসজি কোচ মাঠে ফুটবলারের মৃত্যুতে সমবেদনা জানালেন মেসি-এমবাপে মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন ‘প্লেব্যাক সম্রাট’ এন্ড্রু কিশোর

ঘরেই খাবার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, প্রসাধনী তৈরি করেন সংগীত-কাব্যা দম্পতি

Reporter Name / ১২৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রভাত ডেস্ক: ভারতের কেরালার সংগীত ও কাব্যা দম্পতির বাড়িতে এমন ব্যবস্থাই চলছে দিনের পর দিন। সঞ্চয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ দিয়ে তৈরি এ বাড়ি বাইরে থেকে দেখতে আর দশটি বাড়ির মতোই সাধারণ—চারপাশে গাছপালা, সবজির বাগান, গরু-মুরগি।

কিন্তু বাড়িটির আসল বিশেষত্ব একটু ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে। এখানে বাগান শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, গরু-মুরগি শুধু পালনের জন্য নয়, আর রান্নাঘরের বর্জ্যও নিছক ফেলে দেওয়ার জিনিস নয়। বাড়ির প্রতিটি অংশকে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত করে সংগীত ও কাব্যা গড়ে তুলেছেন নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর স্বনির্ভর এক ব্যবস্থা।

এ বাড়িতে বসবাস শুরুর আগে দশ বছরের বেশি সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন সংগীত ও কাব্যা। চাকরি তাঁদের দীর্ঘ ভ্রমণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে দুজনই চাকরি ছেড়ে ফ্রিল্যান্স কাজ করা শুরু করেন। ভ্রমণে তাঁদের জীবনযাপনের ধরন ছিল প্রচলিত পর্যটকদের চেয়ে আলাদা। গাড়িতেই রান্না করতেন, সঙ্গে রাখতেন প্রয়োজনীয় খাবার, তাঁবু ও অল্প কিছু কাপড়। হোটেল বা রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মতো করে চলতেন।

অনেক সময় কোনো জলাশয় বা পুকুরে কাপড় ধুয়ে শুকিয়ে আবার যাত্রা। প্রতিদিনের খরচও তাঁরা যতটা সম্ভব সীমিত করে এনেছিলেন। ভ্রমণের পথে কম জিনিসে চলা, নিজের খাবার নিজে তৈরি করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেঁচে থাকার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, বাড়িতে থিতু হয়ে সেটিই যেন আরও স্থায়ী রূপ পেয়েছে। রাস্তায় গাড়ির ছোট পরিসরে যেসব কাজ করতেন, সেগুলোই এখন নিজেদের জমি ও বাড়িকে ঘিরে করছেন।

বাড়ির বাগানে সব ধরনের সবজি চাষ করেন সংগীত ও কাব্যা। মাছও চাষ করেন। ধান ফলানোর চেষ্টাও চলছে। বাড়িতে কৃষিকাজের পাশাপাশি তাঁরা পশুপালনও করেন। রয়েছে গরু ও মুরগি। গরু থেকে মিলছে দুধ, মুরগি থেকে ডিম। ফলে প্রতিদিনের খাবারের অনেকখানি অংশের জোগান তাঁরা বাড়ি থেকে পান।

মাস শেষে তাই বাজারের খরচ অনেকটাই কমে যায়। নিজের হাতে ফলানো সবজি তুলে রান্না করা কিংবা বাড়ির উৎপাদিত খাবার খাওয়ার আনন্দই আলাদা। তার চেয়ে বড় কথা, খাবারের জোগান যখন বাড়ি থেকেই আসে, তখন বাজারের ওপর নির্ভরতাও অনেকখানি কমে যায়।

গরুর গোবরও তাঁদের এ স্বনির্ভর ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান, যা ব্যবহৃত হচ্ছে রান্নার জ্বালানি বায়োগ্যাস তৈরিতে। সংগীত-কাব্যার বাড়ির একটি অংশে রয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। রান্নাঘরের পচনশীল বর্জ্য ও গরুর গোবর সেখানে দেওয়া হয়। অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে অণুজীবের মাধ্যমে এসব জৈবপদার্থ ভাঙার প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় বায়োগ্যাস। রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয় সেই গ্যাস।

বায়োগ্যাস তৈরির পর প্ল্যান্টে যে অবশিষ্ট পদার্থ থাকে, সেটিও কৃষিকাজে ব্যবহার করেন তাঁরা। ফলে বাড়িটিতে তৈরি হয়েছে একধরনের ছোট চক্র—গরুর গোবর যাচ্ছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে, সেখান থেকে তৈরি হচ্ছে রান্নার জ্বালানি আর গ্যাস উৎপাদনের পরের অবশিষ্ট অংশ ফিরে যাচ্ছে কৃষিকাজে। সেই কৃষি থেকেই আবার মিলছে খাবার।

বাড়ির বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এই দম্পতি ব্যবহার করেন সৌরশক্তি। বাড়ির ছাদে থাকা সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সেচের কাজেও ব্যবহার করেন তাঁরা। এখানেও লক্ষ্যটা একই—বাইরের উৎসের ওপর যতটা সম্ভব কম নির্ভরতা। আর প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে তা থেকে আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

বাড়িটির আরেকটি অংশে মাশরুম চাষ করেন সংগীত–কাব্যা। এ ফসলের জন্য বিশাল জমির প্রয়োজন হয় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মাশরুমের ক্ষেত্রে উপযুক্ত তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে পারলেই তুলনামূলক ছোট জায়গায় মাশরুম চাষ করা সম্ভব। তাঁরা ২৫ দিন অন্তর মাশরুম সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ বাড়ির প্রতিটি কোণকে শুধু থাকার জায়গা হিসেবে না দেখে উৎপাদনের কাজে লাগাচ্ছেন তাঁরা।

বাড়ির চারপাশে বসানো কাঠের বাক্সে তৈরি করা হয়েছে মৌমাছির বাসা। সেখান থেকে পাওয়া যায় মধু। ফুল থেকে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় পরাগায়নেও ভূমিকা রাখে মৌমাছি। ফলে বাগানের ফুল, ফসল ও মৌমাছির মধ্যেও তৈরি হয়েছে একটি প্রাকৃতিক যোগসূত্র।

স্বনির্ভরতার পরিধি শুধু খাবার কিংবা জ্বালানিতে থেমে নেই। সংগীত ও কাব্যা ঘরেই তৈরি করেন দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য প্রসাধনপণ্য। কাজল, ময়েশ্চারাইজার ও ফেসওয়াশের মতো ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী নিজেদের বাড়ির নারকেল কিংবা কমলা, আমলকীর মতো উপকরণ দিয়ে তৈরি করছেন তাঁরা। ফলে বাড়ির গাছগুলো শুধু খাবার বা অক্সিজেনের উৎস নয়; দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটানোরও উৎস।

১৫ সেপ্টেম্বর ঘরোয়া ছিমছাম এক আয়োজনে পবিত্র জল ও মন্ত্রের মাধ্যমে সামান্থা ও তাঁর অনাগত সন্তানের অশুভ বিষয় দূর করে জীবনে শান্তি, সুস্থতা ও মঙ্গল কামনা করা হয়।

প্রকৃতির সঙ্গে এই দম্পতির সম্পর্ক অবশ্য বাড়ির সীমানায় থেমে নেই। দীর্ঘ ভ্রমণের সময়ও তাঁরা পরিবেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। গত দেড় বছরে ভ্রমণের পথে ১০ হাজারের বেশি গাছের চারা লাগিয়েছেন তাঁরা।

লাগানো গাছগুলোর অবস্থান জিপিএস ট্র্যাকের মাধ্যমে নজরে রাখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় সেগুলোতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। আগামী পাঁচ বছরে তাঁদের এক লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য।

বাগান থেকে আসছে খাবার, গরু থেকে দুধ ও গোবর, গোবর থেকে বায়োগ্যাস, কৃষিতে কাজে লাগছে অবশিষ্ট অংশ। সূর্য থেকে বিদ্যুৎ আর মৌমাছি থেকে মধুর পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে পরাগায়নে সহায়তা। একটি ব্যবস্থার ‘বর্জ্য’ যেন অন্য ব্যবস্থার সম্পদ হয়ে ফিরে আসছে।
সব মিলিয়ে এই বাড়ি যেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাপনের ছবি। বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, বাড়ির ভেতরের সম্পদকে বারবার কাজে লাগিয়ে এবং প্রয়োজনকে কিছুটা সীমিত করে ফেলে জীবনযাপনের একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছেন সংগীত ও কাব্যা।

তথ্যসূত্র: ইনস্টাগ্রাম, টাইমস লাইফ, দ্য বেটার ইন্ডিয়া


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category