• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণা

দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি হিসাবেই শূন্যপদ ৭২ হাজার

Reporter Name / ৬ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বৈশ্বিক সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে অন্তত ৪৪ দশমিক ৫ জন দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ) থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ১২ দশমিক ৭৮ জন— যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের মাত্র ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের স্বাস্থ্য খাতে এখনো ৭১ শতাংশ দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।
কেবল মোট সংখ্যার ঘাটতিই নয়, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ক্ষতটি হলো চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ অনুপাতের চরম ব্যবধান। ডব্লিউএইচও’র আন্তর্জাতিক আদর্শ অনুপাত অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স এবং ৫ জন মিডওয়াইফ (১: ৩: ৫) থাকা আবশ্যক। অথচ মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ১: ০.৭৪: ০.০৭৫। চিকিৎসকের চেয়ে নার্স ও ধাত্রীদের এই চরম স্বল্পতার কারণে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাসেবা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকদের এমন অনেক প্রশাসনিক ও সহায়ক কাজ করতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মে নার্সদের করার কথা।
এক ঐতিহাসিক জনমিতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের ইতিহাসে এখন নির্ভরশীল মানুষের চেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫ থেকে ৬৪ বছর) সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যাকে অর্থনীতি ও জনসংখ্যা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। এই বিরল সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বহুগুণ শক্তিশালী করার প্রধান শর্তই হলো একটি সুস্থ, দক্ষ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা। কিন্তু দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের যে বাস্তব চিত্র, তা এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে দেশের স্বাস্থ্য জনবলের এক ভয়াবহ ও হতাশাজনক চিত্র। ‘পটেনশিয়ালস অব হেলথ ওয়ার্কফোর্স ফর হারনেসিং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ইন বাংলাদেশ: অপরচিউনিটিজ, চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক এই গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র স্বাস্থ্যকর্মী সংকট, ভৌগোলিক বৈষম্য, নীতিনির্ধারণী শূন্যতা এবং সরকারি পদের বিশাল শূন্যতার কারণে দেশ প্রতি বছর প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কর্মঘণ্টার চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট বা মিডওয়াইফ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দীর্ঘদিন নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল, বর্তমানে সংখ্যাটি কিছুটা বাড়লেও নার্সদের একটি বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে আসছে, যাদের মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাছাড়া ডিপ্লোমাধারীদের তুলনায় বিএসসি নার্সের সংখ্যা ও তাদের সরকারি নিয়োগ— দুই-ই কম। তিনি বলেন, দেশে মিডওয়াইফারি সেবা মাত্র শুরু হয়েছে। অথচ মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে হলে চিকিৎসকদের তুলনায় মিডওয়াইফদের সংখ্যা অন্তত পাঁচগুণ বেশি হওয়া উচিত। মিডওয়াইফরা শুধু বড় হাসপাতালেই নন, সরাসরি মাঠপর্যায়ে বা কমিউনিটিতে গিয়ে কাজ করবেন এবং গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে নিরাপদ প্রসব করাতে উদ্বুদ্ধ করবেন। মিডওয়াইফদের এই সেবা নিশ্চিত করা না গেলে কোনোভাবেই মাতৃমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব নয়।
একদিকে হাসপাতালগুলোতে সেবার জন্য হাহাকার, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য প্রশাসনে জমে উঠেছে শূন্যপদের বিশাল পাহাড়। ২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি হিসাব ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অধিদপ্তরে মোট অনুমোদিত পদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য! এরমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪৮ হাজার ৫২টি পদ শূন্য (যার মধ্যে চিকিৎসকদের পদই খালি ২২.৫%)। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৬ হাজার ৯২১টি পদ শূন্য (যার ফলে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত)। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ৫ হাজার ৩৩৩টি পদ শূন্য। মোট শূন্যপদ ৭১ হাজার ৭৬৫টি। এই বিশাল শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রমাণ দেয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে অসংক্রামক রোগ যেমন— ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও কিডনি সমস্যার প্রকোপ অনেক বেড়েছে, যেগুলোর জন্য রোগীকে নিয়মিত ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক টেস্ট করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব ওষুধ বা টেস্টের সুবিধা সব সময় না পাওয়ায় ব্যয়ের পুরো বোঝাটা জনগণের ওপরেই পড়ে। বিশেষ করে কোনো পরিবারের কারও হঠাৎ ক্যানসার, কিডনি প্রতিস্থাপন বা লিভারের মতো বড় অসংক্রামক রোগ দেখা দিলে সেই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবার সুযোগ সব অঞ্চলে সমান নয়। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীকে বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়, কিংবা অনেকে দেশের বাইরে যান। এই যাতায়াত ও চিকিৎসার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ না থাকায় মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়। ফলশ্রুতিতে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় এবং দারিদ্র্যের এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, দেশে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে চিকিৎসকের সংখ্যা কম নয়। মূল সমস্যা হলো তাদের বণ্টন বা ডিস্ট্রিবিউশনে। দেশের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও মোট চিকিৎসকের ৮০ শতাংশ থাকেন শহরে। এছাড়া চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সরকারি সিস্টেমের বাইরে বেসরকারি খাতে কাজ করছেন। স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য জনবলের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে নার্স আর মিডওয়াইফ সংখ্যা বাড়ানো উচিত। অথচ এটি নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। একইভাবে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক হলেও তাদের এখনো সেভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে এই উপেক্ষিত জনবলগুলোকে ফোকাস করা এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category