• রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ১১:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা বিএনপির সংসদ সদস্যের ছেলেকে আটক করল পুলিশ ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের মামলায় দুই দিনের রিমান্ডে জিসান সাঘাটায় স্কুল কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে ছাত্রশিবির নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সৎ বোন ও মাকে ঘরছাড়া করার অভিযোগ কচুয়ায় বিএনপি নেতা সরদার জাহিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ বাবাকে নিয়ে যে গানগুলো আজও ছুঁয়ে যায় হৃদয় ৮ হাজার টাকা আয় করে ৪ হাজার দিতেন স্কুল বেতন, বাবার স্মরণে আবেগী তৌসিফ বাবার ভরসার হাতটা চলে গেলে বোঝা যায় পৃথিবী কত ফাঁকা: চঞ্চল চৌধুরী ‘মানুষ আজও তাঁকে মনে রেখেছে’, বাবাকে নিয়ে ফাহমিদা নবী

কাঁচা কাজুবাদামে শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব: উদ্বেগে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকারকেরা

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

প্রভাত রিপোর্ট: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের কাজুবাদাম প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, নতুন শুল্ক কাঠামোর কারণে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের দাম স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করা পণ্যের চেয়ে কম হয়ে যাবে। ফলে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলো হুমকির মুখে পড়বে।
এ খাতে নেতৃস্থানীয়রা বলছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে উল্টো শুল্ক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে স্থানীয় কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির আওতায় ভারত থেকে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এই নীতির কারণে দেশের প্রায় ২০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে পড়বে এবং এ খাতে পরিকল্পিত শত শত কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। এ সংকট দুই ক্যাটাগরির পণ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে—একটি খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম, যা স্থানীয় কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়; অন্যটি খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম, যা সরাসরি বাজারে বিক্রি হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম উৎপাদন করতে প্রায় পাঁচ কেজি কাঁচা কাজুবাদামের প্রয়োজন হয়।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযাগী, খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে মোট করের হার ১৩.৫৮ শতাংশ থেকে ব্রে ৪০.৩৮ শতাংশে দাঁড়াবে। অথচ একই সময়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম সাফটা চুক্তির আওতায় শুল্ক সুবিধা পেতে থাকবে, যার ফলে উচ্চ আমদানি শুল্কের প্রভাব তাদের ওপর পড়বে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জমা দেওয়া উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত শুল্ক কাঠামোর কারণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতি কেজি প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৭২৫ টাকা। এর বিপরীতে ভারত থেকে আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের বাজারমূল্য হবে প্রতি কেজি প্রায় ১ হাজার ২৮২ টাকা। অর্থাৎ দেশীয় ও আমদানিকৃত কাজুবাদামের মধ্যে কেজিতে ব্যবধান দাঁড়াবে প্রায় ৪৭১ টাকা। উদ্যোক্তারা বলছেন, এত বড় ব্যবধানের কারণে দেশীয় উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি অলাভজনক হয়ে পড়বে।
গ্রিন হার্ভেস্ট ফ্রেশ প্রডিউস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল ইসলাম আজাদ বলেন, ‘এই শুল্ক কাঠামো যদি পরিবর্তন করা না হয়, তাহলে কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কারণ আমদানিকারকরা আমাদের উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে বাজারে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম বিক্রি করতে পারবেন।’ তিনি আরও বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অপ্রতুল হওয়ায় বাংলাদেশ বেশিরভাগ কাঁচা কাজুবাদাম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আমদানি করে। রবিউল বলেন, ‘চাহিদা মেটাতে আমাদের মূলত আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানি করতে হয়। এই দেশগুলো সাফটার অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় আমাদের পুরো আমদানি শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। অথচ ভারত থেকে যারা প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানি করেন, তারা সাফটা চুক্তির আওতায় বিশেষ শুল্ক সুবিধা পাচ্ছেন।’
এনবিআর কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছেন।, কম দামি আমদানিকৃত পণ্যের ধাক্কা থেকে স্থানীয় কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন এবং দেশে উৎপাদিত কাজুবাদামের জন্য তাদের আরও ভালো মূল্য পাওয়া উচিত। তবে প্রক্রিজাতকরণ শিল্পের উদ্যোক্তাদের দাবি, এ ধরনের নীতি বাস্তবায়নের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এখনো অনেক কম।
এ খাতের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার টন খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম উৎপাদন হয়, যেখানে এর বার্ষিক চাহিদা ১৫ হাজার টনেরও বেশি। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার টন খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে স্থানীয় কারখানাগুলো জোগান দেয় মাত্র ৮০০ টন, বাকি ২ হাজার ২০০ টনই আসে আমদানির মাধ্যমে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ‘বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতা সচল রাখতেই প্রক্রিয়াজাতকারীদের প্রতি বছর ৪ হাজার টনের বেশি কাঁচা কাজুবাদামের প্রয়োজন হয়। অথচ দেশীয় উৎপাদন এর মাত্র অর্ধেক। তাই আমদানি আমাদের জন্য বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।’
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজুবাদাম চাষের প্রসারের ওপর ভর করে প্রায় এক দশক আগে বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। তবে উদ্যোক্তাদের বলছেন, শুরু থেকেই আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনকারী উদ্যোক্তা শাকিল আহমেদ তানভীর জানান, বছরের পর বছর লোকসান দেওয়ার পর ২০২২ সালে তার কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কারণ আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম স্থানীয় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বাজারে বিক্রি করা হয়।’ নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সম্প্রতি দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ এই খাতে বিনিয়োগ করেছে।
বিএসআরএম ২০২৩ সালে চট্টগ্রামে একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা চালু করে এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও বড় পরিসরে কারখানা গড়তে ১৫৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়।
কাজী ফার্মসও এ খাতে প্রায় ১৮১ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তবে এই খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলছেন, প্রস্তাবিত শুল্ক কাঠামোতে পরিবর্তন না এনে এটি চূড়ান্ত করা হলে এই বিপুল বিনিয়োগ থমকে যেতে পারে কিংবা উদ্যোক্তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
তারা বলেন, শুধু আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় শিল্পকে কার্যকর সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে সাফটা চুক্তির আওতায় শুল্ক ছাড়ের সুবিধা বহাল থাকবে। অন্যদিকে তানজানিয়া, বেনিন, আইভরি কোস্ট ও ঘানার মতো দেশগুলো থেকে কাঁচা কাজুবাদাম আমদানিতে পুরো শুল্কের বোঝাই বইতে হবে।
এ সমস্যা সমাধানে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উদ্যোক্তারা আমদানি শুল্ক বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশ থেকে আনা খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছেন। তারা বলছেন, সম্পূরক শুল্ক সব দেশ থেকে আমদানির ওপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং সাফটা চুক্তির শুল্ক সুবিধা দিয়ে একে এড়ানো যাবে না।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যাশু প্রসেসরস-এর সভাপতি মোহাম্মদ আজাদ ইকবাল পাঠান বলেন, ‘শুধু আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না, কারণ সাফটা চুক্তির কারণে এর কার্যকারিতা কমে যায়। সম্পূরক শুল্ক আরোপ হলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং কম দামি আমদানিকৃত কাজুবাদামের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে পারবে।’


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category